আলুর উত্পাদন এলাকাখ্যাত বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রত্যায়িত আলুবীজ সংকটে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। মানসম্পন্ন আলুবীজ সংগ্রহের জন্য কৃষকরা বিএডিসির (বীজ) আঞ্চলিক বীজাগারে ধরনা দিলেও চাহিদানুযায়ী বীজ আলু মিলছে না।
বিএডিসি বীজাগারে বীজ না পেয়ে কৃষকরা ধরনা দিচ্ছেন ডিলারের কাছে। কিন্তু সেখানে সরকারি নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশিদামে বীজআলু কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ চাষিদের। বিএডিসির বীজ না পেয়ে অনেকেই হিমাগারে স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা আলুবীজ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই বেসরকারি কোম্পানির বীজ সংগ্রহ করছেন। কিন্তু বেসরকারি কোম্পানির এসব বীজ খুব একটা মানসম্পন্ন নয় বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৫৫ হাজার ৪৫৫ হেক্টর জমিতে আলুচাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এজন্য বীজআলুর চাহিদা রয়েছে ৮৪ হাজার মেট্রিক টন।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবুল কাশেম মো. আযাদ বলেন, ৮৪ হাজার মেট্রিক টন আলুবীজের চাহিদার বিপরীতে বিএডিসি মাত্র ৩ হাজার ৩১০ মেট্রিকটন আলুবীজ সরবরাহ করছে। অর্থাত্ চাহিদার মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ বীজ মিলছে বিএডিসি থেকে। অবশিষ্ট বীজের জন্য কৃষকদের হিমাগারে স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা বীজ এবং বেসরকারি কোম্পানির বাজারজাত করা বীজের ওপর ভরসা করতে হবে। বিএডিসির বীজ পরপর তিন মৌসুম পর্যন্ত জমিতে লাগাতে পারবেন চাষিরা। তবে সে ক্ষেত্রে বীজের শতভাগ বীজের মান নিশ্চিত হবে সেটা বলা যাবে না।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরো বলেন, ‘কৃষকদের চাহিদার খুব সামান্যই প্রত্যায়িত আলুবীজ সরবরাহ করতে পারে বিএডিসি। চাহিদার সুযোগ নিয়ে কেউ বেশি দামে বীজ বিক্রি করলে সেটা দেখার দায়িত্ব উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির। আর মান যাচাই করার দায়িত্ব সরকারের বীজ প্রত্যায়ন এজেন্সির।’
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি-বীজ) বগুড়ার আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, এ কার্যালয় থেকে বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলায় অনুমোদিত দেড় শতাধিক ডিলারের মাধ্যমে ফসলের বীজ বিপণন করে আসছে বিএডিসি। এবার দুই জেলায় আলুবীজের চাহিদা রয়েছে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন। বিএডিসি থেকে দুই জেলায় ডিলার ও কৃষকদের মাধ্যমে আলুবীজ সরবরাহের জন্য বরাদ্দ মিলেছে ৬ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন।
জানা গেছে, জয়পুরহাট জেলায় চলতি মৌসুমে আলুবীজের চাহিদা ৬০ হাজার মেট্রিক টন। এরমধ্যে বিএডিসির আলুবীজের চাহিদা ১৬ হাজার মেট্রিক টন। ডিলার ও কৃষকদের মাধ্যমে বিএডিসি ২ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন আলুবীজ সরবরাহ করছে। অর্থাত্ সেখানে বীজের মোট চাহিদার ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ বীজের সরবরাহ মিলছে বিএডিসি থেকে। জেলার দুপচাঁচিয়া, শিবগঞ্জ এবং সদর উপজেলার কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, এবার হিমাগারে সংরক্ষণ করা আলুবীজের দাম অত্যন্ত চড়া। এ কারণে তারা প্রত্যায়িত বীজ সংগ্রহের জন্য কৃষি বিভাগের সুপারিশ নিয়ে বিএডিসির আঞ্চলিক বীজাগারে ধরনা দেন। কিন্তু সেখানে ধরনা দেওয়ার পর নস্ফিল হয়ে খালিহাতে ফিরতে হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া ও জয়পুরহাটে ৪৭টি হিমাগার রয়েছে। তবে বীজ সংরক্ষণের জন্য আলাদা বিশেষায়িত কোনো হিমাগার নেই। সাধারণ হিমাগারে সংরক্ষক্ষিত বীজ মানসম্পন্ন নয়। কারণ এসব হিমাগারে সঠিক তাপমাত্রায় বীজ সংরক্ষণ করা হয় না এবং অন্য আলুর সঙ্গে বীজআলু রাখায় ভাইরাসের সংক্রামণ থাকে। এসব বীজ দিয়ে ভালো ফলন সম্ভব না হওয়ায় কৃষকরা নিবিড় পরিচর্যায় উত্পাদিত এবং বিশেষায়িত হিমাগারে সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষিত বিএডিসির বীজ সংগ্রহের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন।
এ ব্যাপারে বিএডিসি (বীজ) বগুড়ার উপপরিচালক জুলফিকার মো. সরোয়ার বলেন, কৃষি বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী বিএডিসি কোনো মৌসুমেই বীজ সরবরাহ করতে পারে না। এবারও কৃষি বিভাগের চাহিদার অনেক কম আলুবীজ বরাদ্দ মিলেছে। তবে হিমাগারে ও কৃষকের ঘরে স্থানীয়ভাবে বীজ সংরক্ষণ থাকায় বিএডিসির বীজ নিয়ে হাহাকার পড়েছে—এবার তেমন চিত্রও নেই। যেসব কৃষক বিএডিসির কার্যালয়ে বীজের জন্য এসেছিলেন কেউ খালিহাতে ফেরত যাননি। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী বীজ সরবরাহ করা যায়নি ঠিক, তবে কেউ একটন চাইলে তাকে ২০০ থেকে ৫০০ কেজি পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
