ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বেপরোয়া যান চালানোর কারণে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আব্দুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মিমের মৃত্যুর ঘটনার মামলায় বাসের দুই চালক ও এক সহকারীকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরো ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাদের। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েস গতকাল রবিবার জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে আদালত বলেছে, চুক্তিতে গাড়ি ভাড়া দেওয়ার কারণে বাসচালক ও সহকারীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি হয়। এই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে গিয়ে বেপরোয়া যান চালনায় অবতীর্ণ হচ্ছেন চালকরা। আর এতেই প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। রায়ে বলা হয়, বাসচালক মাসুম বিল্লাহ ও জুবায়ের সুমন আগে থেকেই অবহিত ছিলেন যে, জিল্লুর রহমান উড়াল সড়ক ঝুঁকিপূর্ণ। এরপরেও ঘটনার দিন তারা যাত্রী তোলার প্রতি-যোগিতায় লিপ্ত হন। এই প্রতিযোগিতায় গিয়ে জাবালে নূরের চালক মাসুম বিল্লাহ দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর গাড়ি তুলে দেন। এতে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব ও দিয়া খান ঘটনাস্থলেই মারা যায়। গুরুতর আহত হয় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। এ কারণে তারা কেউ এ ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না। এজন্য দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় তাদেরকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হলো।
রায় শুনে বিচলিত হন দণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাসচালক মাসুম বিল্লাহ ও জোবায়ের সুমন। তারা জাবালে নূর পরিবহনের ব্যানারে চলা দুটি বাসের চালক ছিলেন। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার কারণেই তারা ওই দুর্ঘটনা ঘটান। এদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বাস মালিক জাহাঙ্গীর আলম ও চালকের আরেক সহকারী এনায়েত হোসেনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। তবে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত চালকের সহকারী আসাদ কাজী পলাতক রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। গ্রেফতারের পর থেকে তার সাজা কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। এদিকে রায় ঘোষণার পরই দণ্ডপ্রাপ্ত দুই চালককে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘বাসচালক ও চালকের সহকারীদের খামখেয়ালিপনার কারণে নিরীহ ছাত্রছাত্রীসহ পথচারী ও যাত্রীরা প্রাণ হারাচ্ছে। এদের কবল থেকে কেউ রক্ষা পাচ্ছেন না। যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে চালকদের আরো সতর্ক থাকতে হবে।’ রায়ে বলা হয়, ‘প্রায়শই গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, হালকা যান চালানোর লাইসেন্স নিয়ে চালকরা ভারী যান চালাচ্ছেন। এটা যাতে কোনোভাবেই না হয় সেদিকে গাড়ির মালিক, চালক ও ট্রাফিক পুলিশদের আরো কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।’
রায়ের পর ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘এ রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে এমন অপরাধে ছাড় নেই। কেউ এ ধরনের অপরাধ করে পার পাবে না। এ রায়ের মাধ্যমে আরো প্রমাণ হয়েছে, এ ধরনের অন্যায়ের শিকার হয়ে আদালতে প্রতিকার পাওয়া যায়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রায় পড়ব এবং বিশ্লেষণ করে যারা খালাস পেয়েছেন তাদের আপিলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব। তবে সার্বিকভাবে রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।’
অন্যদিকে মাসুম বিল্লাহর আইনজীবী হাসিম উদ্দিন বলেন, ‘রায়ে আমরা অসন্তুষ্ট। ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তাদের সন্তুষ্ট করতে এ রায় দেওয়া হয়েছে।’ চালক জুবায়ের সুমনের আইনজীবী টি এম আসাদুল হক বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। আমার মক্কেল জুবায়ের সুমনের গাড়িটি দাঁড়িয়ে ছিল। পেছন থেকে অন্য একটি গাড়ি তার গাড়িটিকে ধাক্কা দেয়। আসামিকে যাবজ্জীবন দিতে হলে মৃত্যুর কারণ প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু সুমনের গাড়ির দ্বারা কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।’
গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর হোটেল র?্যাডিসনের বিপরীত পাশের জিল্লুর রহমান উড়াল সড়কের ঢালের সামনের রাস্তার ওপর জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাস রেষারেষি করতে গিয়ে একটি বাস রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের ওপর উঠে যায়। এতে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল করিম রাজীব (১৭) ও একাদশ শ্রেণির দিয়া খানম মিম (১৬) নিহত হন। আহত হন আরো নয়জন। এ ঘটনায় দিয়া খানমের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। ঐ মামলায় জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাসের মালিক শাহাদাত হোসেন ও জাহাঙ্গীর আলম, দুই চালক ও চালকের দুই সহকারীকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে শাহাদাত হোসেনের মামলার কার্যক্রম হাইকোর্টে স্থগিত রয়েছে। প্রসঙ্গত, এই দুর্ঘটনার প্রতিবাদে দেশ জুড়ে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ঐ আন্দোলনের কারণে সরকার পরবর্তীকালে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়।
