শামীম শিকদার
নবান্ন উত্সব হলো নতুন আমন ধান কাটার পর সেই ধান থেকে প্রস্তুত চালের প্রথম রান্না উপলক্ষ্যে আয়োাজিত উত্সব। সে ক্ষেত্রে ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থ ‘নতুন অন্ন’। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান পাকার পর এই উত্সব অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে রাজধানী ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে নবান্ন উত্সব উদ্যাপন শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে গবেষকদের মতে, কৃষিপ্রথা চালু হওয়ার পর থেকে নবান্ন উত্সব পালন হয়ে থাকে। তবে ’৪৭-এর দেশভাগের পর এই উত্সব ধীরে ধীরে কদর হারাতে থাকে।
অগ্রহায়ণের হিম হিম হেমন্ত দিনে আনন্দধারায় ভাসে কৃষকের মন-প্রাণ। কারণ তখনই আমন ধান কাটার মাহেন্দ্র সময়। বাড়ির উঠান ভরে ওঠে নতুন ধানের ম ম গন্ধে। নতুন ধানের ভাত মুখে দেওয়ার আগে কোথাও কোথাও মিলাদ, মসজিদে শিন্নি দেওয়ার রেওয়াজ আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কৃষকের ঘরে পূজার আয়োজন চলে ধুমধামে। কৃষিভিত্তিক সভ্যতার পুরোভাগে থাকা এই নবান্ন উত্সব অনাদিকাল থেকে বাঙালির জীবন অধিকার করে আছে। মেয়েকে নাইয়র আনা হয় বাপের বাড়ি। নতুন চালের ভাত আর সেই চাল ভাঙিয়ে চালের পিঠা তৈরি করা হয়। মেয়ে-জামাই থেকে শুরু করে নিকট আত্মীয়স্বজনের আগমনে মুখরিত হয় পুরো বাড়ি। খাওয়া হয় বিভিন্ন রকম পিঠাপুলি। গ্রামবাংলার প্রতি ঘরে ঘরে তৈরি করা হয় দুধ পুলি, তিল পুলি, নারিকেল পুলি দুধের পিঠা, তেলের পিঠা, সেমাই পিঠা, ভাঁপা পিঠা, চিতই পিঠা, মুঠি পিঠা ও পাটি সাপটা পিঠা। এ সময় বিবিধ ব্যঞ্জনে অন্নাহার, পিঠেপুলির উত্সবের আনন্দে মুখর হয় জনপদ। আগে নবান্ন উত্সবে খাবার খাওয়ার প্রতিযোগিতা করা হতো। যে যত বেশি খেতে পারত, তাকে উপহার দেওয়া হতো দুগ্ধবতী গাভি কিংবা ছাগল। বিভিন্ন স্থানে মেলা বসত। নবান্ন উত্সবকে ঘিরে কৃষকরা আয়োজন করত লাঠিখেলা, হা-ডু-ডু, ষাঁড়ের লড়াই, নৌকাবাইচসহ বিভিন্ন খেলাধুলার।
দেশের কোনো কোনো অঞ্চলে লক্ষ্মীপূজা, পিতৃশ্রাদ্ধ, বীরবাঁশ—এই তিনটি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর কাকবলি করা হতো। বাড়ির উঠানের মাঝখানে একটি গর্ত করা হয়। তার চারপাশে পিটুলি দিয়ে আলপনা আঁকা হয়। গর্তে জ্যান্ত কই মাছ ও কিছু দুধ দিয়ে একটি বাঁশ পোতা হয়। সেই বাঁশের প্রতি কঞ্চিতে ধানের ছড়া বাঁধতে হয়। এটাকে বীরবাঁশ বলে। এ প্রথা সব অঞ্চলে প্রচলিত না থাকলেও বরিশালে প্রচলিত। একটি কলার ডোগায় নতুন চাল, কলা, নারকেল নাড়ু কাককে খাওয়াতে হয়। এ প্রথার নাম হচ্ছে কাকবলি। নবান্ন উত্সবের অন্যতম প্রথা হচ্ছে এটি। প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে, কাকের মাধ্যমে ঐ খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। একসময় ঢেঁকির সুরেলা শব্দ ফুটিয়ে তুলত নবান্ন উত্সব। বাড়ি বাড়ি পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যেত। অগ্রহায়ণের নতুন ধান ঘরে আনার আগে মাটি ও গোবর গুলিয়ে বাড়ির আঙিনা ও ধানের গোলা লেপে পরিপাটি করা হতো। লোকজন নতুন ধানের আঁটি মাথায় করে এনে ফেলত লেপে রাখা ঐ উঠোনে। এরপর মাড়াই করে ধান রোদে শুকিয়ে মচমচে করা হতো। সেই ধান ঢেঁকিতে কুটে চাল তৈরির পর ঐ চাল গুঁড়ো করে তৈরি করা হতো পিঠা-পায়েস। কৃষকরা সারাদিন কায়িক পরিশ্রম করে উঠানের পাশে বসে যেতেন খেতে। ঋতুচক্রে এই সময় শীতের আগমন ঘটে বিধায় খেজুরগাছে শুরু হয় গাছিদের হাঁড়ি তোলা। একদিকে নতুন ধানের আতপ চাল, অন্যদিকে খেজুরের রস। এই দুয়ের রসায়নেও তৈরি হতো মুখরোচক পায়েস।
নবান্ন উত্সবের সঙ্গে মিশে আছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলার ঐতিহ্যগুলো ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে। আজকের গ্রামবাংলার শিশুরা যেন স্বপ্নের মধ্যে নবান্নের উত্সবের ইতিকথা বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদির মুখে মুখে শোনে। বর্তমানে আমনের জায়গা দখল করেছে আউশ-আমন-বোরো ধান। যেখানে আগে কৃষকের প্রধান শস্য ছিল আমন ধান। প্রযুক্তির উত্কর্ষতায় ধান থেকে চাল উত্পাদন হওয়া পর্যন্ত সব কাজই এখন যান্ত্রিক পদ্ধতিতে হচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন জাতের উচ্চফলনশীল ধান বাজারে আসায় নতুন ধানের গন্ধ হারিয়ে যাচ্ছে এবং স্বল্প সময়ে ওইসব ধান উত্পন্ন হওয়ায় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উত্সব হারিয়ে যেতে বসেছে। অন্যদিকে খেলার মাঠের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই ডিজিটাল যুগে খেলার জায়গা বলতে এক চিলতে বারান্দা। শিশুদের খেলার মাঠের জায়গা দখল করে নিয়েছে ট্যাব, মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের ছোট্ট মনিটর। দুরন্ত শৈশবটাই যেন হারিয়ে যাচ্ছে তাদের। নগরায়ণ আর আধুনিকতার অজুহাতে বিলীন হচ্ছে সব ঐতিহ্য। তেমনি গ্রামীণ জনপদে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ আছে; কিন্তু কৃষকের ঘরে নেই নবান্নের আমেজ। এমন করে নীরবে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উত্সব কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে। নবান্ন পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী উত্সব। নবান্ন এক অসাম্প্রদায়িক উত্সব। এ উত্সব বাঙালি জাতিকে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করে। তাই কালের বিবর্তনে হারাতে বসা বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য পিঠা-পুলি উত্সবে গ্রামবাংলার জনপদ আবার মুখরিত হয়ে উঠুক।
n লেখক :শিক্ষার্থী, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
