পরিকল্পনার অভাবই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১৩

মো. শফিকুল ইসলাম নিয়ামত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসযোগে রওনা হলাম পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। রাজশাহী থেকে পাবনা যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। ভাবলাম বেকার বসে থেকে লাভ কী? একটা ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে পড়তে থাকলাম। ম্যাগাজিনে একজন ছাত্র অথবা উদ্যোক্তা কীভাবে পরিকল্পনা মোতাবেক আগাবে সেটার বিশদ বিবরণ ছিল। বিষয়টা নিয়ে ভেবে দেখলাম, একজন ছাত্র সে সারাদিনে কী করবে, এই পরিকল্পনা যদি তার আগে ঠিক করা না থাকে, তাহলে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়ে সে অগ্রগণ্য থাকবে। ক্লাসে আমার স্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে বলছিলেন যে, ‘একটি ভালো পরিকল্পনা কাজের অর্ধেক’। আমি যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং করছিলাম তখন আমার এক বন্ধু প্রতিদিন গড়ে ১২ ঘণ্টা লেখাপড়া করত। সকালে বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসত জেলা গ্রন্থাগারে সন্ধ্যা অবধি পড়তেই থাকত। এত লম্বা সময় লেখাপড়া করেও তার কোথাও চান্স হয়নি। তার চান্স না হওয়ায় আমারও খারাপ লেগেছে! আরো একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মেসে আমরা তিন বন্ধু একই রুমে থাকতাম। তার মধ্যে এক জন খুবই অলস প্রকৃতির ছিল। মোবাইল এবং ঘুমেই তার দিনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় হতো। আমার দেখা, সে ফেসবুক, ইউটিউব এবং বাকি সময় ঘুমের কারণে পড়ার খুব একটা সময় পেত না। যা-ই হোক, পরিকল্পনা বলতে আমরা বুঝি একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সম্পন্ন করার জন্য কিছু ধাপ। এই ধাপগুলো যদি কারো আগে থেকেই তৈরি থাকে তাহলে তার লক্ষ্য অর্জনে সুবিধা হয়। একটি ভালো পরিকল্পনা মানচিত্রের মতো। মানচিত্র দেখে যেমন একটি নির্দিষ্ট স্থানে সহজেই যাওয়া যায় তেমনি পরিকল্পনার ছক আঁকা থাকলেও বুঝতে সুবিধা হয় যে, কত টুকু পথ পাড়ি দেওয়া হয়েছে এবং লক্ষ্য অর্জনে কতটুকু বাকি আছে। পরিকল্পনার মাধ্যমে জানা যায় লক্ষ্যে পৌঁছাতে কতটুকু সময় লাগবে? কীভাবে কাজ করতে হবে? শুরুতেই আমার এক বন্ধুর উদাহরণ দিয়েছি এখন তার কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করা যাক। সে প্রতিদিন প্রায় ১২ ঘণ্টা পড়ত কিন্তু পড়ার মাঝে আমি তাকে কখনো ৫ অথবা ১০ মিনিট বিশ্রাম নিতে দেখিনি। একজন মানুষের মস্তিষ্ক ৫০ মিনিট একটানা কাজ করার পর স্বভাবতই একটু বিশ্রাম চাইবে কিন্তু যদি এই বিশ্রামটুকু না দিয়ে অনবরত কাজ চালিয়ে যাওয়া হয় তাহলে পরবর্তী সময়ে পড়াগুলো মাথার ওপর দিয়ে যাবে—এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অধ্যবসায় একটা ছাত্রের গুণ হবে তাই বলে মানবীয় বৈশিষ্ট্য অস্বীকার করে নয়। হিতে বিপরীত হবে। একজন ছাত্রের সৃষ্টিশীলতা ফুটিয়ে তুলতে অথবা লক্ষ্যে পৌঁছতে অধ্যবসায়ের পাশাপাশি মানবীয় গুণগুলোকে প্রাধান্য দেবে তার সাধনা সুন্দর হওয়ার জন্য। আর এই মানবীয় গুণগুলো হলো প্রার্থনা, খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলা, ঘুম। পরিমিত পরিমাণে খাওয়া-দাওয়া, প্রার্থনা, ৬-৮ ঘণ্টা ঘুম এবং শরীরচর্চা মনকে প্রফুল্ল রাখে। এছাড়া সে যে কাজটি করবে ওই বিষয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে পরামর্শ করবে। পরামর্শ ব্যতীত পরিকল্পনাও সুন্দর হয় না। দ্বিতীয় যে বন্ধুর কথা বলেছি, সে তার জ্ঞান-গরিমায় ঠিক ছিল, সে বলত যে পড়শোনা করতে হবে কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন ঘটাত না। ফেসবুকের চোখ ধাঁধানো সব কন্টেন্টের নেশায় সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করত। সে মূলত সঠিকভাবে কোনো কিছুতেই মনোযোগী হতে পারত না। দুই মিনিট বই দেখার পরেই আবার মোবাইল নিয়ে বসে যেত। অর্থাত্ সম্পূর্ণ এলোমেলো একটা পরিস্থিতিতে চলত। এগুলো সবই ছিল মূলত পরিকল্পনার অভাবের কারণেই । সে যদি সময়কে ভাগ করে কাজ করত, তাহলে সেও লক্ষ্যে পৌঁছত বলে মনে করি।

আগেই বলেছি, পরিকল্পনা কাজের অর্ধেক। লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেউ যদি পরিকল্পনা অনুসারে আগায়, তাহলে অবশ্যই সাফল্য লাভ করবে। অনেক সময় দেখা যায় যে, অনেকের লক্ষ্য ঠিক থাকে কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোনো পরিকল্পনা নেই, এজন্য লক্ষ্যে পৌঁছাতেও পারে না। কোনো কাজে সাফল্য পেতে হলে প্রথমে একটা লক্ষ্যকে নির্দিষ্ট করে ঐ লক্ষ্যে যেতে কী কী তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন, সেই সব তথ্য বিশ্লেষণ করা, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা এবং প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা লক্ষ্যে পৌঁছতে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না। এভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে আশা করা যায় সবাই ব্যর্থতার গ্লানি ঢাকতে সক্ষম হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়