বইপ্রেমীরা সাধারণত সময় নিয়ে বই পড়তে ভালোবাসেন। তবে এমন অনেক পাঠক রয়েছেন যারা দ্রুত বই পড়তে অভ্যস্ত। কেউ তো এক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ করতে চান একটি বই। এত দ্রুত একটি বই পড়ে শেষ করলে অনেকের পক্ষেই বই থেকে সব তথ্য গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে; অন্য কথায় পুরোপুরি বুঝতে সমস্যা হয়। কিন্তু এমন কিছু কৌশল রয়েছে যেগুলো মানুষকে দ্রুত বই পড়ার পাশাপাশি ভালোভাবে বুঝতেও সাহায্য করে।
দ্রুত বই পড়ার জন্য প্রাচীনকাল থেকেই এমন কিছু কৌশল চালু ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত একটি কৌশল হলো—স্কিম রিডিং। স্কিম রিডিং হলো—বইয়ের পাতায় প্রতিটি লাইনে কেবল চোখ বুলিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বের করে বোঝার চেষ্টা করা। আর এই কাজটি সহজ করতে বইয়ের লাইন বরাবর হাতের আঙুল বা কলম ব্যবহার করা; যেন চোখ, অন্য কোনো লাইনে সরে না যায়। এতে মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না এবং চোখ ঐ নির্দিষ্ট লাইন বরাবর রাখা সম্ভব হয়। সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট শব্দগুলো সহজেই চিহ্নিত করা যায়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় মেটা গাইডিং।
আবার এমনও কিছু কৌশল রয়েছে যার মাধ্যমে এক সঙ্গে কয়েক লাইন পড়া সম্ভব। বর্তমানে সেই কাজটি অর্থাত্ দ্রুত বই পড়ে বোঝার জন্য বিকাশ লাভ করেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। এখন বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশনে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ লিখে দিলে, ঐ অ্যাপই পুরো বই খুঁজে আপনার জন্য শব্দগুলো বের করে দেবে। শব্দগুলো স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করতে থাকবে। ডিজিটাল এই পদ্ধতির বদৌলতে যে কারো বই পড়ার গতি অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। তবে প্রশ্ন হলো—এই দ্রুত গতিতে পড়ার মধ্যে বইয়ের তথ্যগুলো কতটুকু বোধগম্য সেটাই বিবেচ্য।যখন এ ব্যাপারে শক্ত প্রমাণের হিসাব আসে, তখন স্পিড-রিডিং-এর সক্ষমতা উন্নত করবে বলে দাবি করা বিভিন্ন বাণিজ্যিক কোর্স এবং অ্যাপ্লিকেশনগুলো মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বাধীন পর্যবেক্ষকরা একটি নিয়ন্ত্রিত অবস্থার অধীনে এই পরীক্ষাগুলো করেন না। এ ব্যাপারে ক্যালিফোর্নিয়ার, সান ডিয়েগোর প্রয়াত মনোবিজ্ঞানী কিথ রায়নার বহু বছর ধরে এমন কয়েকটি কৌশলের পিছনে থাকা গঠন পদ্ধতিগুলো মূল্যায়ন করেছেন। চোখের চলাচল অনুসরণের মাধ্যমে তিনিই প্রথম পড়ার গতি নিয়ে গবেষণা করেন। ২০১৬ সালে, তিনি একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যেখানে আমাদের পড়ার গতি বাড়ানোর চেষ্টা সম্পর্কে বিজ্ঞান কী বলতে পারে সেই বিষয়গুলো তুলে আনা হয়। যখন আমরা পড়ি, তখন আমাদের চোখের ভেতরে রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশ সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শব্দ শনাক্ত করে। রেটিনার এই কেন্দ্রটিকে ফোভে বলা হয় যেখানে কোনজ নামের কোষ উচ্চ মাত্রায় রয়েছে। এই কোষগুলো পৃষ্ঠার হালকা এবং অন্ধকার অংশের প্যাটার্ন শনাক্ত করে এবং সেই তথ্য মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয় যেখানে প্যাটার্নটিকে শব্দ বলা হয়।
কিছু স্পিড-রিডিং পদ্ধতির লক্ষ্য হলো—মানুষকে পেরিফেরিয়াল ভিশনের মধ্যে থাকা লেখাগুলো আরো দ্রুত পড়তে শেখানো, যাতে মানুষ একবারে একাধিক শব্দ গ্রহণ করতে পারে। পেরিফেরিয়াল ভিশন হলো—কেন্দ্রের আশেপাশের যে বিষয়বস্তুগুলো দৃষ্টির মধ্যে থাকে। তবে রেটিনার পেরিফেরি বা পরিধিতে কোনজের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম থাকে এবং এখানকার কোষগুলোকে রডস বলা হয়। কোনজের মতো রডস বইয়ের পাতার আলো ও অন্ধকার অংশের প্যাটার্ন এত ভালোভাবে শনাক্ত করতে পারে না।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দ্রুত পড়তে শেখার একটি ভালো উপায় হলো নিয়মিত অনুশীলন করা। আবার আমরা কেবল আমাদের দৃষ্টি দ্বারা সীমাবদ্ধ নই। গুরুত্বপূর্ণ হলো—আপনি কোনো শব্দ কত দ্রুততার সঙ্গে শনাক্ত করতে পারছেন সেটা। যদি শব্দটি অনেক পরিচিত হয় তাহলে পড়ার গতিও স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। সুতরাং সাধারণ নিয়ম বলা যেতে পারে যত বেশি পড়া হবে তত দ্রুত তা বুঝতে সুবিধে হবে।—বিবিসি
