বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির গণশুনানিতে অভিমত

অযৌক্তিক বিদ্যুত্ প্রকল্পে চাপ বাড়ছে ভোক্তাদের

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:৩০

বিদ্যুত্ কোম্পানিগুলোতে অনেক অযৌক্তিক প্রকল্প গ্রহণের কারণে উত্পাদন ও পরিচালন খরচ বেড়ে যায়। এই ব্যয় সামলাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। যার চাপ পড়ে ভোক্তাদের ওপর। আবার সাধারণ ব্যক্তি পর্যায়ের বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিল কয়েক মাস বকেয়া থাকলেই লাইন কেটে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো যতটা তত্পর ততটা তত্পর নয় সরকারি বিলখেলাপীদের বিরুদ্ধে। তাই প্রকল্পের যৌক্তিকতা নির্ধারণে এবং সরকারি সংস্থাগুলো যেন বকেয়া রাখতে না পারে সেজন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

গতকাল সোমবার রাজধানীর টিসিবি মিলনায়তনে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে ভোক্তাদের পক্ষে এমন বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। ঢাকায় বিদ্যুত্ বিতরণকারী দুই সংস্থা ঢাকা পাওয়ায় ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) ও ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) গ্রাহক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গতকাল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

শুনানিতে ডেসকো প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বিতরণ ব্যয় এক টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখে। তাদের প্রস্তাবনা যাচাই করে কমিশনের মূল্যায়ন কমিটি ৮১ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করে। ডিপিডিসির এক টাকা ২৪ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিপরীতে মূল্যায়ন কমিটি ৮৭ পয়সা বৃদ্ধি যৌক্তিক বলে জানিয়েছে।

ডেসকো এবং ডিপিডিসি- দুই কোম্পানিই বলছে পাইকারি বিদ্যুতের দাম না বাড়লে তাদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। দুই কোম্পানিই লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে মূল্যায়ন কমিটি বলেছে—কমিশন পাইকারি বিদ্যুতের দাম যতটা বৃদ্ধি করবে সে অনুযায়ী খুচরা দাম বাড়ানো যেতে পারে।

শুনানিতে অংশ নিয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে ডিপিডিসি গঠনের সময় ১ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছে। এখন সব মিলিয়ে ডিপিডিসির সম্পদ ১৪ হাজার কোটি টাকা। নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ করার ফলে ডিপিডিসির সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু ডিপিডিসির এই প্রকল্প গ্রহণ কতটা যৌক্তিক তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এজন্য কমিশনকে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটি বিবেচনা করবে প্রকল্প গ্রহণ যৌক্তিক ছিল কি না। তিনি বলেন, অনেকক্ষেত্রেই প্রকল্প গ্রহণের জন্য অদৃশ্য চাপ থাকে। এখানে ডিপিডিসিরও কিছু করণীয় থাকে না। ওপর মহলের এ চাপ জনগণের ওপর বেদম চাপ তৈরি করছে।

মূল্যায়ন কমিটি তাদের সুপারিশে বলেছে, দীর্ঘ দিন বিল না দেওয়ার কারণে অনেক গ্রাহকের বিলম্ব মাশুল বিলের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। সংগত কারণে এই বিল আদায়ে বিপাকে পড়ছে বিতরণ কোম্পনিগুলো। তাই বকেয়া বিলের ওপর পাঁচ শতাংশ হারে সরল সুদ ধরে এসব বিল আদায় করা যেতে পারে।

সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভাসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিপুল পরিমাণ বকেয়া রয়েছে। শুনানিতে ডিপিডিসি জানায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে তাদের ১৫৮ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এই বকেয়া অর্থ আদায়ে তাদের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। বকেয়া টাকা না দিলে জানুয়ারি মাসে লাইন কেটে দেওয়া হবে।

কারিগরি কমিটি বলছে গ্রাহকের নিরাপত্তা জামানতের অর্থ কোম্পানিগুলো নিজের আয়ে অন্তর্ভুক্ত করছে। যা আইনসংগত নয়। এই অর্থ পৃথক একাউন্টে রাখতে হবে। কোন কারণে গ্রাহক লাইন ছেড়ে দিলে তার নিরাপত্তা জামানত সুদসহ ফেরত দিতে হবে। কমিটি আরো বলেছে, এখন প্রিপেইড মিটার লাগানো হচ্ছে। এর আগে গ্রাহক ডিজিটাল মিটার ব্যবহারের সময় বিতরণ কোম্পানি যে নিরাপত্তা জামানত নিয়েছিল তা ফেরত দেওয়া উচিত। এ বিষয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, গ্রাহক আবেদন করলে তাদের এই অর্থ ফেরত দিচ্ছে তারা। কিন্তু অধিকাংশ গ্রাহক আবেদন না করাতে তা বিতরণ কোম্পানির কাছেই থেকে যাচ্ছে। প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নিয়েও কমিশনে ভোক্তারা অভিযোগ করেছে। বিতরণ কোম্পানি বলছে বিদ্যুত্ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী তারা ৪০ টাকা করে প্রিপেইড মিটারের ভাড়া নিচ্ছে। একটি মিটারের আয়ুষ্কাল ১০ বছর ধরে এই ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন, মিটারের দামের চেয়ে এই ভাড়া দ্বিগুণ। আবার কোনো কারণে মিটার লক হলে খুলে দিতে ৬০০ টাকা চার্জ নেওয়া হচ্ছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলামের সভাপতিত্বে কমিশনের অপর সদস্য রহমান মুর্শেদ, মিজানুর রহমান, মাহমুদউল হক ভুঁইয়া শুনানি গ্রহণ করেন। ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান এবং ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহিদ সারোয়ার শুনানিতে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন।