যোগাযোগপ্রযুক্তির অসাধারণ অগ্রগতিতে সারা বিশ্ব আজ গ্লোবাল ভিলেজ বা বিশ্বগ্রামে পরিণত হইয়াছে। ইহার ফলে আধুনিক জীবনযাত্রার সহিত তাল মিলাইতে গিয়া মানুষ ক্রমশই প্রযুক্তিনির্ভর হইয়া পড়িতেছে। ইহার ভালো-মন্দ দুই দিকই রহিয়াছে। প্রযুক্তি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে অতি সহজ, আরামদায়ক ও ফলদায়ক করিয়া তুলিয়াছে। পক্ষান্তরে প্রযুক্তি বেগ (গতি) সঞ্চার করিলেও কাড়িয়া লইতেছে মানুষের আবেগ। পাশের মানুষটিকেও সরাইয়া দিতেছে বহু দূরে। আবার কখনো কখনো প্রযুক্তির অতিরিক্ত ও বাড়াবাড়ি ব্যবহার মানুষের প্রাণহানির কারণও হইয়া দাঁড়াইতেছে। বিশেষ করিয়া স্মার্টফোন মানুষকে সব সময় অনলাইনে সংযুক্ত থাকিবার সুযোগ করিয়া দিয়াছে। কিন্তু স্মার্টফোনে মেসেজ করিতে গিয়া কিংবা গেম খেলিতে খেলিতে রাস্তা চলিতে গিয়া হরহামেশাই ঘটিতেছে দুর্ঘটনা। ভয়ংকর পন্থায় সেলফি তুলিতে গিয়াও অনেকে নিজের সর্বনাশ ডাকিয়া আনিতেছে। সড়ক, রেল এমনকি নৌপথ—সর্বত্র এই অসতর্ক ব্যবহার লক্ষ করা যাইতেছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে ইডেন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের এক ছাত্রী উবারের মোটরসাইকেলে করিয়া ফার্মগেট আসিতেছিলেন। বিজয় সরণিতে আসিয়া তাহার মোবাইল ফোনটি বাজিয়া উঠিলে তিনি ভ্যানিটি ব্যাগ হইতে মোবাইলটি বাহির করিয়া ফোন ধরিতে গিয়া অসতর্ক অবস্থায় চলন্ত মোটরসাইকেল হইতে পড়িয়া মৃত্যুবরণ করিয়াছেন। মোটরসাইকেল চালকেরা অনেক সময় মোবাইল ফোনে আলাপরত অবস্থায় কাত হইয়া, মাথা কাত করিয়া অমনোযোগী হইয়া চলাচল করিয়া থকেন। চলন্ত অবস্থায় গুগলে পথের নিশানা বা রাইড শেয়ার খুঁজিয়া নিতেও দেখিতে পাওয়া যায় অনেককে। বাস-ট্রাক-মাইক্রোবাস-অটোরিকশার চালকদের দ্রুতগতিতে চলিবার সময় মোবাইল ফোনে কথা বলিবার দৃশ্য তো নিত্যনৈমিত্তিক। মোবাইল ফোনে কথা বলিতে বলিতে রাস্তা চলাচল ও পারাপারের দৃশ্য প্রায়শ দৃষ্টিগোচর হয়। চালক মোবাইল ফোনে কথা বলিতে বলিতে নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া দুর্ঘটনার শিকার হইয়াছেন, এমন দৃষ্টান্ত কম নহে। তবে সবচাইতে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে মোবাইল ফোনে কথা বলিতে বলিতে বা হেডফোনে গান শুনিতে শুনিতে রেললাইন দিয়া চলাচল বা পারাপারের সময়। রেল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ হইতে টঙ্গী পর্যন্ত রেলপথে বত্সরে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়। ইহার একটি বড়ো কারণ রেললাইন দিয়া চলিবার সময় মোবাইল ফোন ও হেডফোনের অসতর্ক ব্যবহার।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-তে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের শাস্তি বৃদ্ধি করা হইয়াছে। এই জন্য অনধিক এক মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ হাজার টাকা এবং একাধিকবার একই অপরাধ করিলে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হইয়াছে। তাহার পরও মানুষ চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহারে সতর্ক হইতেছে না। এত মৃত্যুর ঘটনার পরও সচেতন হইতেছে না সাধারণ মানুষ। এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নহে, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলিতেও আছে। এই জন্য নিউ ইয়র্কসহ আমেরিকার বেশ কয়েকটি শহরে রাস্তা পারাপারের সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করিয়া আইন পাশ করা হইয়াছে। ইহার ব্যত্যয় হইলে ৫০ হইতে ১৫০ ডলার জরিমানা গুনিতে হইবে। তবে শুধু আইন বা জরিমানা নহে, সকলের উচিত নিজের জীবনের সুরক্ষার কথা ভাবিয়া এই ব্যাপারে সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করা। নিজের ডিভাইস হইতে চোখ তুলিয়া সতর্ক হইয়াই গাড়ি চালাইতে হইবে, সাবধানে পথ চলিতে হইবে পথচারীদের। ইহাতে শুধু প্রাণই বাঁচিবে না, বাস্তব জগতের সঙ্গে ক্ষীণ হইয়া আসা যোগাযোগও তৈরি হইবে।
