বৃক্ষরোপণের সংস্কৃতি তৈরি করিতে হইবে

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৫১

বৃক্ষের গুরুত্ব কতখানি, তাহা এখন প্রাথমিক শ্রেণির শিশুরাও জানে। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের একটি সংস্থা জানাইয়াছে যে, এখনই অন্তত ১ লক্ষ কোটি বৃক্ষ রোপণ করিতে পারিলে পৃথিবীতে ১০০ বত্সর আগেকার পরিবেশ ফিরিয়া আসিবে। যদিও শতবর্ষ পূর্বেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়া গিয়াছেন—‘দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর।’ সুতরাং পরিবেশের উপর বেশ নিষ্ঠুর অত্যাচার তখন হইতেই শুরু হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু বর্তমান অবস্থা দেখিলে রবীন্দ্রনাথ বোধ করি অধিক শোকে পাথর হইয়া যাইতেন। এমতাবস্থায় সুইজারল্যান্ডের জুরিখে সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (ইটিএইচজুরিখ) গবেষকেরা বলিতেছেন, একমাত্র ব্যাপক বৃক্ষরোপণ করিতে পারিলেই মিলিতে পারে বাঁচিয়া থাকিবার উপযুক্ত বিশুদ্ধ বায়ু। আর তাহার জন্য লাগাইতে হইবে ১ লক্ষ কোটি বৃক্ষ! ঐ গবেষণাপত্রে ইহাও বলা হইয়াছে যে যদি মানুষের সদিচ্ছা আর আন্তরিকতা থাকে, তাহা হইলে দ্রুত ১ লক্ষ কোটি বৃক্ষ রোপণ করিতে খুব বেশি অসুবিধা হইবে না। পৃথিবীর স্থলভাগে শহর আর মফস্বলের জমি বাদ দিয়া গবেষকেরা দেখিয়াছেন, বৃক্ষ রোপণের জন্য ৯০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা খালি পড়িয়া রহিয়াছে।

এই ক্ষেত্রে তুরস্কের দৃষ্টান্ত আমাদের অনুপ্রাণিত করিতে পারে। গত ১১ নভেম্বর তুরস্কে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত হইবার সময় দেশটিতে রাতারাতি ১ কোটি ৩০ লক্ষ বৃক্ষ রোপণ করা হইয়াছে। এক তুর্কি নাগরিক বলিয়াছেন, ‘ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো বৃক্ষ রোপণের জন্য একটি সরকারি ছুটি হইলে কেমন হয়? পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি সবুজ পৃথিবী রাখিয়া যাইতে চাহি।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বার্তা ভাইরাল হইয়া গেলে তুরস্কে বৃক্ষরোপণের মহোত্সব চলে। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগিতে পারে, পৃথিবীতে মোট কতসংখ্যক বৃক্ষ রহিয়াছে? যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা বলিয়াছেন, পৃথিবীতে বৃক্ষের সংখ্যা ৩ লক্ষ কোটি। অর্থাত্, পৃথিবীতে যত বৃক্ষ রহিয়াছে, তাহার তিন ভাগের এক ভাগ বৃক্ষ আরো অতিরিক্ত রোপণ করিলে এই পৃথিবীর বায়ুর মান একশত বত্সর পূর্বের মতো হইয়া যাইবে। অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ তথ্য হইল, বিশ্বে প্রতি বত্সর ১৫ বিলিয়ন বৃক্ষ নিধন করা হয়। ইহার বিপরীতে রোপণ করা হয় মাত্র ৫ বিলিয়ন বৃক্ষ। বৃক্ষের সমাহারে শুধু জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা পায় না, সুপেয় পানিও ধরিয়া রাখে বৃক্ষ। এই কারণে কোনো এলাকায় বৃক্ষের পরিমাণ কমিয়া গেলে সেইখানে মরুকরণ, ভূমিধস ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়িয়া যায়। তাহা ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছোবলকে প্রশমিত করিতেও বন তথা বৃক্ষরাজি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। যেমনটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা ও বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতি কমাইতে ভূমিকা রাখিয়াছে সুন্দরবন। একটি জনপদে যেই ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার, বাংলাদেশের তাহা নাই। গত বত্সরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট আয়তনের ১৭ শতাংশ সম্মিলিতভাবে বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা রহিয়াছে। একসময় ইহা ছিল ৯ শতাংশের কাছাকাছি। সুতরাং বাধ্যগত কারণে বৃক্ষ কর্তণের পাশাপাশি যদি আরো অধিক সংখ্যায় বৃক্ষ রোপণ করা যায়, তাহা হইলে পৃথিবী নূতন করিয়া সজীব হইবার সুযোগ পাইবে। এই জন্য বৃক্ষরোপণকে নিজেদের সংস্কৃতির অংশ করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে।