মোবারক হোসেন খান

তারার দেশে গুণী অগ্রজ

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৫৩

বাংলাদেশের সংগীত এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশকে আমরা বলি গানের দেশ। এখানে মানুষ আনন্দ-বিরহ ভ্রমণ-বিবাহ এমনকি নৌকা বাইতেও গান গায়। গান গায় বাড়ির ছাদ পেটাতে গিয়ে। সে দেশে গানের আকাল চলছে বললে কি খুব একটা ভুল বলা হবে? দেশে এখন গান মানে হইচই তোলপাড় করার নামে বুক কাঁপানো যন্ত্র আর গলার অত্যাচার। নবীন গায়ক-গায়িকাদের আলাদা করে চিহ্নিত করার সুযোগ নাই। তাদের প্রতিভা যাই থাক একটু ওপরে উঠলেই বেলুনের মতো মিলিয়ে যায়। শুদ্ধ ক্লাসিক নামে পরিচিত গানের অভাবে ধুঁকছে বাংলা গানের জগত্। ঠিক এমন সময় মোবারক হোসেন খানের প্রয়াণ সংবাদ নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। একদিকে যেমন শোকের আরেক দিকে আমাদের অগ্রজ ও অভিভাবকহীনতার বিষয়টিকে মনে করিয়ে দিয়েছে এই খবর।

মোবারক হোসেন ১৯৩৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তত্কালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের এক সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ একজন প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী এবং মাতা উমার উন-নেসা। তার চাচা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ। ছয় ভাইবোনের মধ্যে মোবারক সর্বকনিষ্ঠ। তার বড়ো দুই ভাই প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ আবেদ হোসেন খান ও বাহাদুর হোসেন খান। এই পরিবার আমাদের গানের জগত্ বা সংগীত জগতের এক বিশাল আকাশ। তাদের পরিবার শাস্ত্রীয় সংগীতে উপমহাদেশের অহংকার। রবি শংকরের স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী থেকে আয়েত আলী খাঁ— বিরাট এই ভূবনের উত্তরাধিকারী মোবারক হোসেন খান বিবাহ করেছিলেন আরেক বিখ্যাত গায়িকা ফওজিয়া ইয়াসমিনকে। ফওজিয়া বাংলাদেশের সংগীত জগতের তারকা পরিবারের একজন। তার বোনদের ভেতর নীলুফার ইয়াসমিন আমাদের প্রাণের মানুষ। যিনি ঘোর আকালেও অতুল প্রসাদ, ডি এল রায় নজরুলকে ধারণ করে থাকতেন। তাদের আরেক বোন মানেই বাংলাদেশ। সাবিনা ইয়াসমিনহীন বাংলাদেশে গানের কোনো ইতিহাস হতে পারে না। সে ঘরের কন্যা ফওজিয়া ইয়াসমিন নিজেই গাইতেন অসাধারণ। সংসার পরিবার স্বামী—সব মিলিয়ে সুখী-সুন্দর জীবনে ত্যাগ করেছিলেন গান। অথবা পরিবেশ তাকে বাধ্য করেছিল ছেড়ে দিতে।

মোবারক হোসেনকে আমি জানতাম গান নিয়ে ভালো ভালো বই লেখার কারণে। বাদ্যযন্ত্র রাগসংগীত যন্ত্রসাধন নিয়ে আর কে কে বই লিখেছেন আমার জানা নাই। তিনি মুক্তিযুদ্ধের গান নিয়েও গ্রন্থ লিখেছেন। সাহিত্যিকও ছিলেন তিনি। আফ্রিকার গল্প, নোবেল বিজয়ীদের গল্প, নোবেল পুলিত্জার বুকার বিজয়ীদের সেরা গল্প নিয়ে বই লিখেছেন। সবচেয়ে বেশি উপকার করে গেছেন নজরুলের ওপর গবেষণামূলক বই লিখে। করুণাময় গোস্বামীর মতো হাতে গোণা কজন ছাড়া এমন গবেষণা আর কারা করেছেন জানা নাই।

তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। জানি না কী কারণে সে পরিচয় গড়িয়েছিল ঘনিষ্ঠতায়। আমি গান ভালোবাসি, গান গাইতে ভালোবাসি, গান শুনতে ভালোবাসি; কিন্তু আমার কোনো সংগীত জ্ঞান নাই। তবু তার মতো মানুষ আমাকে ভালোবেসেছিলেন। জীবনে এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্য আমাকে পুলকিত বিস্মিত ও গর্বিত করে রেখেছে। মান্না দে থেকে সুরকার গায়ক আজাদ রহমান সবার স্নেহ আর ভালোবাসায় সিক্ত জীবনে ইনিও ছিলেন তেমন একজন। বয়স হয়েছিল তার। তারপরও সকাল সকাল ঢাকা থেকে ফোন করতেন। সব গল্পের মূল একটাই—গান লেখা আর কুশল বিনিময়।

আমরা এখন সবদিক থেকে এক ধরনের বিপজ্জনক সময় পার করছি। মানুষে মানুষে সম্পর্কের এত অবনতি আগে দেখা যায় নি। বায়বীয় সম্পর্কের অন্তরালে চাপা পড়ে গেছে মানবিক ও দেখাদেখির সম্পর্ক। কেউ কাউকে না দেখা অদৃশ্যালোকের এই সম্পর্ক নষ্ট করে দিয়েছে মূল্যবোধ। যোগাযোগ এক বিষয় আর এমন সম্পর্কের আড়ালে সবকিছু ঢাকা পড়ে যাওয়া আরেক। সে দিক থেকে এরাই ছিলেন আমাদের অভিভাবক।

এই যে তিনি লোকান্তরিত হলেন কজন সে খবর জানেন? যারা সংগীত সাধনা করেন, যারা গান করেন তারাও কি জানেন কে তার পিতা? কী তাদের বংশপরিচয়? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতনে আছে ওস্তাদ আয়েত আলী খার মর্মর মূর্তি। ওয়াহিদুল হকের কথা জানলে জানা হয়ে যায় খুলে যায় বিশ্বজগতের অসীম ভান্ডার। সেই ওয়াহিদ ভাইয়ের লেখায় পড়েছিলাম ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর অসামান্য জীবন কাহিনি। আজ আবার তা মনে পড়ল তার পুত্রের প্রয়াণ দিনে।

প্রয়াত মোবারক হোসেনের গুণী পুত্র সরোদ বাজিয়ে তামিম হায়াত খান রাজিত থাকে সিডনিতে। সে আমার বুক ভরিয়ে দেয় কাকু ডেকে। সে সূত্রে আমি হারালাম আমার অগ্রজকে।

জীবনের ওপারে চলে যাওয়া ওস্তাদ মোবারক হোসেন খান আপনি যেখানে থাকুন না কেন ভালো থাকুন। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জেগে থাকবেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সংগীত জগতে আপনি আপন মহিমায় চির উজ্জ্বল।

n লেখক: সিডনি প্রবাসী