দেশে কিডনি পাওয়া সহজ হলেও ট্রান্সপ্ল্যান্টের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। মাত্র চারটি হাসপাতালে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের ব্যবস্থা আছে। এই চার হাসপাতাল হলো :সরকারি ন্যাশনাল কিডনি ইনস্টিটিউট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), কিডনি ফাউন্ডেশনসহ আরেকটি বেসরকারি হাসপাতাল। এ কারণে রোগীরা কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে বিদেশে যান।
বিশেষজ্ঞরা জানান, রোগীদের বিদেশমুখিনতা কমাতে দেশের আটটি মেডিক্যাল কলেজে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেবা চালু করা প্রয়োজন। এই আট মেডিক্যাল কলেজ হলো :ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ট হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
প্রতি বছর বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ মারা যায় কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে। শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি। আগে বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়ে, মামা, চাচা, খালা ও ফুফু কিডনি দিতে পারতেন। আইন সংশোধন করার ফলে মামাতো ভাইবোন, খালাতো ভাইবোন ও ফুফাতো ভাইবোন কিডনি দিতে পারবেন। গতকাল হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী আত্মীয় ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও কিডনি দিতে পারবেন। এতে কিডনি পেতে হয়রানি কমবে।
দেশে ২ থেকে ৫ লাখ টাকায় কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা যায়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা লাগে। সিঙ্গাপুরে লাগে ১ কোটি এবং থাইল্যান্ডে লাগে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। দেশে চাহিদা অনুযায়ী সেবার জায়গা কম থাকায় রোগীরা সময়মতো কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট ও ডায়ালাইসিস করাতে পারছে না। চাহিদা অনুযায়ী চিকিত্সার ব্যবস্থাও গড়ে উঠছে না। এতে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের বেশি সমস্যা হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, প্রতি বছর কিডনি রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বলা হচ্ছে, দেশে বর্তমানে ২ কোটিরও বেশি মানুষ কিডনির সমস্যায় ভুগছে। কিডনি রোগের চিকিত্সা ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশে বিনা চিকিত্সায় মারা যায় ৯০ শতাংশ মানুষ। কারণ আক্রান্তদের মধ্যে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র রোগীই বেশি। তারা কিছুদিন চিকিত্সা করার পর অর্থের অভাবে চিকিত্সা বন্ধ করে দেয়। এই শ্রেণির মধ্যে মৃত্যুর হার সর্বাধিক। সচেতনতার অভাবে এই রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। প্রায় ৭৫ শতাংশ কিডনি বিকল হওয়ার পরই এই রোগ ধরা পড়ে। প্রতি বছর কিডনি রোগে আক্রান্তদের মধ্যে মারা যায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ। কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও প্রখ্যাত কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুনুর রশীদ বেশ কয়েক বছর আগে রোগীদের ওপর বিভিন্ন জরিপ চালিয়ে এই পরিসংখ্যান নির্ধারণ করেন। এই পরিসংখ্যানই বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। তবে এই পরিসখ্যান সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা। তারা বলেন, জাতীয় পর্যায়ে এ নিয়ে কোনো গবেষণা বা পরিসংখ্যান করা হয়নি, যে কারণে কিডনি রোগীর ব্যাপারে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রোভিসি অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল আলম জানান, কিডনি প্রতিস্থাপনের জায়গা বাড়াতে হবে। কারণ চাহিদা অনুযায়ী ট্রান্সপ্ল্যান্টের সুযোগ না থাকায় রোগীদের বিদেশে গিয়ে বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। কারণ চাহিদা অনুযায়ী সীমিত পরিসরে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছে, বিভিন্নভাবে চিকিত্সা নিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে রোগী। অপরদিকে কিডনিদাতা পাওয়া সহজ হওয়ায় পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের হার ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। ভেজাল খাবার খাওয়া, খাদ্যসামগ্রীতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কীটনাশক ব্যবহার না করা কিডনি রোগী বাড়ার উল্লেখযোগ্য কারণ। বিশেষ করে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কিডনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. নিজাম উদ্দিন চৌধুরী জানান, কিডনি রোগীদের চিকিত্সার জায়গা বাড়াতে হবে। কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, কিডনি রোগের চিকিত্সা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। চাহিদা অনুযায়ী চিকিত্সাব্যবস্থাও সীমিত। তিনি বলেন, কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে মাত্র ২ শতাংশ গুরুত্ব দেওয়া হয়, বাকি ৯৮ শতাংশ গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজসহ রাজধানীর কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের উদ্যোগ নিচ্ছি। এসব হাসপাতালের অভিজ্ঞতার আলোকে বিভাগীয় হাসপাতালে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট, হূদেরাগ ও ক্যানসারের চিকিত্সাব্যবস্থা চালু করব।’
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাদের বয়স ষাটের বেশি, তাদের প্রতি তিন জনের মধ্যে একজনের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বিদ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সংখ্যা ২০৩০ সালে দ্বিগুণ এবং ২০৫০ সালে তিন গুণ হবে।
