ফেরারী ফরহাদ, দেশের প্রতিভাবান লেখক ও নাট্যকার। নোলক চলচ্চিত্রের জন্য চলতি বছর সেরা স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে পেয়েছেন ‘ভারত-বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’। সম্প্রতি তিনি ব্যস্ত আছেন বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নিয়ে। বর্তমান ব্যস্ততা, ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিতে গল্পের সঙ্কট ও চলচ্চিত্রের নানা অবস্থা নিয়ে তিনি সম্প্রতি বিনোদন প্রতিদিনের মুখোমুখি হয়েছেন।
সাক্ষাত্কার নিয়েছেন নুরুল করিম
আপনার বর্তমান ব্যস্ততা প্রসঙ্গে জানতে চাই—
পরিচালক সাইফ চন্দনের ‘ওস্তাদ’ সিনেমার সংলাপ লিখেছি। এখন ব্যস্ত আছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে একটি বিশেষ দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কাজ নিয়ে। শোয়েব চৌধুরীর কাহিনি অবলম্বনে এটির চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখছি আমি। এছাড়া ৬০ মিনিটের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কাহিনি, সংলাপ ও চিত্রনাট্য লিখছি। অপূর্ব রানা পরিচালনা করবেন এটি। নাম ‘পুঁথিকর’। এই মাসের মাঝামাঝি সময়ে শুটিংয়ে শুরু হবে।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চলচ্চিত্রটি প্রসঙ্গে বলুন—
চলচ্চিত্রটির নাম ‘জনক ও সন্তান’। এটির নির্দেশনা দেবেন চিত্রপরিচালক নুর মোহাম্মদ মনি। আগামীকাল থেকে শুটিং শুরু হবে। আসলে জাতির জনককে নিয়ে চিত্রনাট্য লিখতে পারার ভাগ্য সবার কলমে ও কপালে হয় না। লিখতে গিয়ে আমার শুধু হাত কাঁপেনি, বুকটাও কেঁপেছে বহুবার। এই জন্য আমি অবশ্যই সৌভাগ্যবান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ক্রাউন এন্টারটেইনমেন্ট আমাকে এই বিশাল দায়িত্ব দিয়েছে, এজন্য আমি তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমার বিশ্বাস ‘জনক ও সন্তান’-আমার সেরা লেখার তালিকায় স্থান পাবে।
এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি, বাংলাদেশি প্রায় সিনেমার গল্পের গাঁথুনির ধারাবাহিকতা থাকে না...
আমরা আসলে মৌলিকত্ব থেকে সরে গিয়েছি। গল্পে ঐতিহ্য, শেকড়ের গন্ধ, নিজস্ব সংস্কৃতি থাকাটা খুবই দরকার। জীবন-জীবিকার গল্প থেকে আমরা সরে গিয়েছি, আধুনিকতার কথা বলে অন্য গল্প দেখানোর চেষ্টা করছি।
চার-পাঁচটি সিনেমা থেকে অল্প অল্প করে নিয়ে গল্প তৈরি করা হচ্ছে। এটার প্রভাব পড়ছে কী?
এসব নিয়ে বলতে গেলে অনেক কথাই চলে আসবে। চার-পাঁচটি সিনেমার গল্প এক করে যে সিনেমা বানানো হচ্ছে সেখানে সৃজনশীলতার কোনো সুযোগই নেই। কপি-পেস্ট করে পুরো গল্প রেডি করা সপ্তাহখানেকের কাজ। কিন্তু মৌলিক গল্পের জন্য সময় দিতে হবে। এক মাস, দু-মাস, তিন মাস, যা সময় লাগে। কিন্তু গল্পকার বা চিত্রনাট্যকার সময়, ইকোনমিক আউটপুট কোনোটিই পাচ্ছেন না। আবার অনেক সময় পরিচালকরা এসে বলেন, ভালো ও মৌলিক গল্প দরকার, সময় এক সপ্তাহ! পারলে কালকেই দিয়ে দেন, শুটিং শুরু করি! কিন্তু তিনি কোন ধরনের গল্প খুঁজছেন নিজেই জানে না। অনেক লেখকই আছেন, ভালো গল্প লেখেন। কিন্তু তারা তো আউটপুট পাচ্ছেন না। যে দেশে খুব সস্তা দামে গল্প বিক্রি হয়, সে দেশে ভালো গল্প আশা করা যায়? দুধের দামে পানি মেশানো দুধের ফ্লেভার পাওয়া যায়, ছানা পাওয়া যায় না । কিছু কিছু মাথামোটারা এই সহজ বিষয়টা বোঝে না।
সবাই বলছে, গল্পের চরম সঙ্কট। আগের দিনের সাহিত্যিকরা সিনেমার গল্প লিখতেন, এখন আপনারা সাহিত্যের বাইরে থাকেন। এ কারণেই কী...
এদেশে মৌলিক গল্প লেখার ক্ষমতা অনেক লেখকই রাখেন। কিন্তু মৌলিক গল্প ক্রয় করে কাজ করার ক্ষমতা অনেকেই রাখেন না। অনেকেই এখন বেঁচে থাকার জন্য কাজ করছেন। ইন্ডাস্ট্রিতে এমনিতেই কাজের অবস্থা খারাপ। বেঁচে থাকার জন্য কাজ করা এক জিনিস, আর সৃষ্টিশীল কাজ করা আরেক জিনিস। এখন যেহেতু বেঁচে থাকার জন্যই কাজ হচ্ছে বেশি, সেখানে মৌলিকত্ব ক্রিয়েশন কতটুকু থাকবে সেটা ভাবার বিষয়। শিল্পী জীবিকার প্রয়োজনে কাজ হচ্ছে, কিন্তু শিল্প জীবনের কাজ মরে যাচ্ছে। তারপরও এখনও একদল স্বপ্নবাজ মানুষ দিনরাত স্বপ্ন দেখে যাচ্ছে এই অঙ্গনটি নিয়ে। এই সেক্টরের পৃষ্ঠপোষকতা খুবই জরুরি। অর্থ লগ্নির নিশ্চয়তা দরকার।
