সুন্দর শোভাময় আর নন্দন প্রভাময়; আমি পৃথিবী। হ্যাঁ, আগে এরকম বৈশিষ্ট্যমণ্ডিতই ছিলাম আমি। এখন আমাকে নিয়ে বুঝি আর এ-ধরনের কথা খাটে না। এখন আমি অসুস্থ। সৌরজগতের গ্রহরূপে আমার জন্ম, আমার বিশালত্ব সে-কথাই বলে। লক্ষ-কোটি বছরের সময়স্রোত আমাতে প্রবহমান। অমোঘ সত্যটা হলো, আমাতে প্রাণের প্রবহমানতা যেমন, অপসৃয়মানতাও তেমন দৃষ্ট হয়। আমি ব্যতীত, কেউ-ই চিরকালীন না। কিন্তু প্রাণীসমূহের প্রজাতির বিলুপ্তি আসন্ন। তোমরা মানুষরা কী না পারো। যা তোমাদের চোখে সভ্যতা, তা আমার চোখে সভ্যতা নয়। এই সভ্যতা তো সুনীতিপ্রসূত নয়। তাই আমার প্রাণময়তার সুন্দর অবয়বটা আজ বিলুপ্তের পথে। মনে হচ্ছে, ধ্বংসটা আবারো অনিবার্য হয়ে উঠেছে। মহাবিপর্যয়টা বুঝি শুরু হওয়ার পথে।
কোনো প্রাণীর অসহায়ত্ব সভ্যতাকে ধারণ করে না। তোমাদের মিথ্যাচার আর অজস্র অনাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘ভগবান, তুমি যুগে যুগে দূত পাঠিয়েছ বারেবারে, দয়াহীন সংসারে, তারা বলে গেল, ভালোবাস সবে, ক্ষমা করো সবে, অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশ।’ কিন্তু তোমাদের অনেকের আত্মগর্বী অভিব্যক্তি এবং দুঃখময়তার অবসান কোথায়? তোমাদের সমগোত্রীয়দের পারস্পরিক অশুভ-অসুন্দরের যতসব কায়কারবার আমাকে গ্রাস করেছে। আমি দুঃখভারাক্রান্ত। কত ধ্বংস, কত নৃশংসতা আমি প্রত্যক্ষ করছি! তোমাদের পরস্পরের মধ্যে সংঘটিত মহা মহা যুদ্ধে আমি কলঙ্কিত ও নিন্দিত। সৌরজগতে তোমাদের জন্যই আমার মর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণ্ন। খুব মনে পড়ে পানিপথ, পলাশি, কারবালা, কলিঙ্গ এবং প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের হত্যাকাণ্ড। দাসপ্রথার নৃশংসতা। চেঙ্গিস খাঁ-হালাকু খাঁর দানবীয় কায়কারবার। একাত্তরে বাঙালি নিধনযজ্ঞ। আরো কত কত হাজার রক্তের হোলিখেলা সংঘটিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। আমি তার নীরব সাক্ষী। আমি বলি, ‘অয়ি মানুষরা, তোমরা কেমন জাত,/তোমরাই একটুতে নাও একহাত।’
অজস্র জ্ঞানদীপ্ত বৈষম্যহীন নিদর্শন আমাতে বিদ্যমান। প্রাণিকুলে তা সমান। খুবই মহিমান্বিত। জগত্-জীবনের জন্য কল্যাণকর। স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি তার। আনন্দাপ্লুত হওয়ার বিষয়। কিন্তু তোমরা তার কিছুই মানো না। শোষণ-বঞ্চনার নগ্নরূপ তোমাদের মধ্যে। আত্মগর্বী আকাশছোঁয়া উল্লাস তোমাদের। চৌর্যবৃত্তিতে মত্ত। শোষকরূপে আত্মপ্রকাশ। যাদের শ্রমে-ঘামে সম্পদের পাহাড়, তারাই বঞ্চনার শিকার। শোষিত। ঐ তো রাস্তায় পড়ে আছে ওরা! ছি ছি! এ-কিসের সভ্যতা! স্রষ্টার অনুকম্পাবঞ্চিত অপকৌশলী তোমরা।
দৃষ্টিনন্দন প্রকৃতির আজ কী নাজুক অবস্থা! ওজোন স্তরের কী বেহালদশা! সূর্যের বিপুল তেজষ্ক্রিয় রশ্মি সরাসরি আমার গাত্রদেশে এসে লাগছে। বিশাল বিশাল বনভূমি নিশ্চিহ্ন। অসম সভ্যতার কার্বন নিঃসরণে প্রাণসঞ্জীবনী অক্সিজেন নিঃশেষ। বৈশ্বিক উষ্ণতা তীব্র থেকে তীব্রতর। বরফ গলে সাগরের উচ্চতা বাড়ছে।
দেখো দেখো, আজ কী হলো আমার! এত তাপ আমার শরীরে! অসহ্য! মহাবিপর্যয়ের মহাপ্রলয় বুঝি বেশিদূরে নেই। আমার সঙ্গে তোমাদের করুণ পরিণতির ভয়াবহ রূপটা তোমরা শীঘ্রই দেখতে পাবে, অপেক্ষা করো।
