পেঁয়াজ লইয়া অভিযোগ এবং বাস্তব চিত্র

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:০৪

পেঁয়াজ লইয়া বাংলাদেশ এবং ভারতে চলিতেছে তুঘলকি কাণ্ড। পেঁয়াজ উত্পাদনে ঘাটতির কথা জানাইয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজের রপ্তানি বন্ধ করিয়া দেয়। ইহার পরপরই বাংলাদেশে পেঁয়াজের মূল্য কেজিতে সেঞ্চুরি হাঁকায়। তাহার পর আরো আড়াই মাস পার হইয়াছে, পেঁয়াজের মূল্যও বাড়িয়াছে আরো আড়াই গুণ। এমতাবস্থায় অভিযোগ করা হইতেছে—ভারত পেঁয়াজ দেয় নাই, তাই অগ্নিমূল্য হইয়াছে। কিন্তু কেহ কি চক্ষু মুদিয়া একটিবার ভাবিয়া দেখিয়াছেন—আমাদের দেশে টিসিবি নিয়ন্ত্রণ করে সরকার, সুতরাং বাজারও সরকারের মুষ্টির মধ্যেই থাকিবার কথা। এখন এই নিয়ন্ত্রণ করিতে গিয়া যদি সংকট সৃষ্টি করিয়া ফেলা হয় এবং তাহাতে যদি বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি-গোষ্ঠীর মুনাফা লুটিবার সুযোগ তৈরি হয়, তাহা হইলে পুরো চিত্রটির অন্য একটি রূপও আমরা দেখিতে পাইব।

উল্লেখ করিবার মতো বিষয় হইল, দিল্লিতেও পেঁয়াজের দাম সেঞ্চুরি হাঁকাইয়াছে। নভেম্বরে পেঁয়াজের দাম ৬১ দশমিক ৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। গোটা বত্সরে বাড়িয়াছে ২৪৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ভারতের কোথাও কোথাও পেঁয়াজের মূল্য দেড় শত রুপি ছাড়াইয়াছে, তাহা  বাংলাদেশি অর্থমূল্যে দুই শতের কাছাকাছি। পেঁয়াজের এমন অগ্নিমূল্য লইয়া হইচই করিয়াছে ভারতের সংসদের বিরোধী সদস্যরা। কিন্তু দাম কবে নিয়ন্ত্রণে আসিবে তাহার কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন নাই দেশটির অর্থমন্ত্রী। অতীতে পেঁয়াজের কারণে গদি উলটাইবারও ঘটনা ঘটিয়াছে। ১৯৯৮ সালে যখন সুষমা স্বরাজ দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখন আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত পেঁয়াজের দাম লইয়া আমজনতার ক্ষোভকে কাজে লাগাইয়াছিলেন। বলা হইয়া থাকে যে, পেঁয়াজের দামের ধাক্কাতেই নাকি সেই সময় দিল্লির রাজ্যসভার গদি হারাইয়াছিল বিজেপি। এমনকি ২০১৫ সালেও ভারতে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ গিয়া পড়ে প্রাদেশিক নির্বাচনের তরণিতে। সুতরাং পেঁয়াজ যেই দেশের রাজনীতিতেও ছড়া ঘোরাইবার হিম্মত রাখে, সেই দেশটি নিজের ঘর সামলাইতে পেঁয়াজ রপ্তানির সিদ্ধান্ত লইতে উহাতে বিস্ময়ের কিছু থাকে না। কিন্তু মুশকিল হইল আমাদের দেশে পেঁয়াজের চাহিদার ৬০ শতাংশ আমদানি করিয়া মিটাইতে হয়। এবং উহার সিংহভাগ আসে ভারত হইতেই। নিকট প্রতিবেশী বিধায় ভারত হইতে পেঁয়াজ আমদানি যতটা সাশ্রয়ীতে সম্ভব; মিশর, পাকিস্তান, চীন, মিয়ানমার, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশ হইতে পেঁয়াজ আমদানিতে পরিবহন খরচের জন্য সাশ্রয়ী হওয়া সম্ভব নহে। অন্যদিকে কমিশনিং এজেন্টরা যাহাদের নিকট হইতে আমদানিকারকদের পণ্য বিক্রি করিয়া কমিশন পান, সেই আড়তদারদের কেহ কেহ ইচ্ছা করিয়াই বাজারে কম পেঁয়াজ ছাড়িতেছে—এমন কথা সংবাদমাধ্যমে বলিয়াছেন কাঁচামাল ক্ষুদ্র আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির এক নেতা। অভিযোগ রহিয়াছে যে, কিছু গোষ্ঠীকে পেঁয়াজ আমদানি করিতে দেওয়া হইয়াছে, যাহারা সুনির্দিষ্ট মাত্রায় মুনাফা করিয়া লইতেছেন পেঁয়াজের মাধ্যমে। সুতরাং পেঁয়াজের ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করিতে না দিলে পেঁয়াজের মূল্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলিয়া মনে করেন অনেকে।

পুষ্টিবিজ্ঞান বলে, নেশার ঘোর কাটাইতে নাকি পেঁয়াজের রস বড়ই উপকারী। পেঁয়াজ লইয়া কোনো গোষ্ঠী অতিমুনাফার নেশায় বুঁদ হইতে থাকিলে তাহাদের রসনায় পেঁয়াজের রস ঢালিয়া দেওয়া প্রয়োজন।