স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও বাংলাদেশের উন্নত হতে না পারার একমাত্র কারণ দেশের বেশিরভাগ মানুষের নীতি-আদর্শের অভাব। রাশিয়া, জার্মানি, ইতালি, জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। নীতি-আদর্শ মেনে মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান, সামরিক শক্তি ও অর্থনীতিক দিক দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে।
একটা দেশের যত সম্পদই থাক না কেন, নীতিবোধ ছাড়া সেই দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি বা শান্তি অর্জন অসম্ভব ব্যাপার। এগুলির অভাবেই তেল, হীরা, সোনার মতো প্রচুর মূল্যবান খনিজ সম্পদ থাকার পরও আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, গিনি, সিয়েরালিওন, আইভরিকোস্টসহ অনেক দেশ আজও সীমাহীন দরিদ্র। এসব দেশের অনেকগুলিতেই চলছে গৃহযুদ্ধ। অথচ তেমন কোনো খনিজ সম্পদ ছাড়াই প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ সত্ত্বেও সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, জাপান, কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর পৃথিবীর উন্নত ও শান্তিপূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের আছে উর্বর কৃষিজমি, বিপুল পরিমাণ খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ। এদেশের ১ কোটিরও বেশি লোক বিদেশে কর্মরত, যাদের অনেকেই নিয়মিত দেশে মূলবান বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। কিন্তু তার পরও এখনো বাংলাদেশ দরিদ্র। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এদেশের ৯ কোটি লোক ভূমিহীন, ৫ কোটি লোক বেকার এবং প্রতি চারজনে একজন ক্ষুধার্ত। এসবের একমাত্র কারণ হচ্ছে দুর্নীতি।
প্রতি বছর এদেশ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়। স্বাধীনতার পর থেকে কী পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। অথচ দুর্নীতি ও অর্থপাচার বন্ধ হলে এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হলে বাংলাদেশ থাইল্যান্ডের চেয়েও উন্নত দেশে পরিণত হতো। নীতি-নৈতিকতাবোধের চূড়ান্ত অভাবের কারণেই দেশের কিছু লোক জনগণের প্রাপ্য অধিকার লুট করে দেশে-বিদেশে নিজেদের ভোগের জন্য ব্যয় করছে। অথচ সীমাহীন দারিদ্রের মধ্যে বাস করছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।
সুতরাং বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে চাইলে প্রত্যেককে নিজে নীতি-আদর্শ মেনে চলার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশীসহ পরিচিতি সবাইকে সত্পথে চলতে উত্সাহিত করতে হবে। তাদের বলতে হবে যে অসত্পথে সাময়িক লাভ হলেও শেষ পর্যন্ত নিজের, পরিবারের ও সন্তানদের বড় রকম ক্ষতি হয়।
চুরি, ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যাংক, শেয়ারবাজার লুট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, যানজট, কিশোর-তরুণসহ সব বয়সীদের নেশায় আসক্ত হওয়া, চলন্ত বাসে নারী নির্যাতন আর সড়ক দুর্ঘটনা—এসব কিছুই নীতিহীনতার চূড়ান্ত ফল। সত্ জীবনযাপনের ফলে প্রাচুর্য না থাকতে পারে, কিন্ত এসব সমস্যার কোনোটাতেই কেউ নিজে বা তার পরিবারের কেউ পড়বে না। তবে এজন্য বেশিরভাগ মানুষকে নীতিবান হতে হবে। শুধু দুই-একজন সত্পথে চললে হবে না।
একইসঙ্গে দেশে অসত্ ও দুর্নীতিবাজদের ঘৃণা এবং সত্-নীতিবান ব্যাক্তিদের সম্মানিত করার চর্চা শুরু করতে হবে। সত্ ব্যক্তিরা যদি সম্মানিত এবং নেতৃত্বে আসতে না পারেন, তাহলে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন কোনোদিনও সম্ভব হবে না।
ঢাকা
