মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালে ঈদুল ফিতর ছিল ২০ নভেম্বর। দিনটি ছিল শনিবার। সারাদেশে চলছে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সেই ঈদ উত্সব পালন করেননি মুক্তিযোদ্ধারা। দেশ স্বাধীন করে ‘বিজয়ের উত্সব’ পালনের ব্রতই যেন করেছিল সবাই।
ঈদের দিনে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সারাদিনই কিছু খাননি। রাতে তিনি খুব গোপনে কলকাতা থেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। কুষ্টিয়ার কয়েকটি ক্যাম্পে যান। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলিত হন। সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া কিছু খাবার বিতরণ করা হয়। তাঁর জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ‘একাত্তরের রণাঙ্গন:অকথিত কিছু কথা’ গ্রন্থে ঈদের দিনের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন- ‘সামনেই আম বাগানের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। মিটমিট করে হারিকেন জ্তলছে। ক্যাম্পের অফিসার এসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দন আহমদকে অভ্যর্থনা জানালেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ কোন প্রটোকলের ধার ধারলেন না। বুকে জড়িয়ে ধরলেন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে।’
এরকম ঈদ মনে হয় জাতির জীবনে আর কখনো আসেনি। আতঙ্ক, দেশ স্বাধীন করার সংকল্প, শরনার্থী শিবিরে অনিশ্চিত জীবন — এসব কিছু ঘিরে ছিল প্রতিটি মানুষের মন। এদিকে, রণাঙ্গনে ঈদের দিনেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চলছিল। সারাদেশে অসংখ্য খন্ড খন্ড যুদ্ধ এবং শহীদ হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। ভুরুঙ্গামারিতে শহিদ হয়েছিলেন বীর উত্তম আশফাকুস সামাদ।
ঈদের আগের দিন কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘জয়বাংলা’র ২৮তম সংখ্যা। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাণী বক্স আইটেম করা হয়। বাণীতে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই, যেদিন আমরা দেশকে শত্রুমুক্ত করব। যথাসর্বস্ব পণ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত, তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিনটি নিকটতর হয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তটিকে এগিয়ে আনার সংগ্রামে আমরা সকলে যেন নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের নিয়োগ করতে পারি, এই ঈদে তাই হোক আমাদের প্রার্থনা।’
তাজউদ্দীন আহমদের মত প্রতিটি বাঙালির প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার প্রত্যাশা ছিল এই একটাই। দেশকে স্বাধীন করা। ১৯৭১ সালে ঈদের দিনেও মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ ছাড়া অন্য কিছু ভাববার অবকাশ ছিল না। কিন্তু যারা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে ছিলেন তাদের মনের অবস্থা ছিল ভিন্ন। উত্তেজনা, আতঙ্ক ও আশংকায় ভরা।
মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালে ঈদ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘দেশের জনগণের দুর্দমনীয় সাহস ও সেনাবাহিনীর জেহাদী শক্তি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার কবচ।’ পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধরত সৈনিকদের জাতির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পাশাপাশি ভারতে উদ্বাস্তুদের দেশে ফেরার আহ্বান জানান ইয়াহিয়া। কিন্তু এসব ফাঁকা বুলিতে ভুলবার দিন তখন শেষ। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঈদের দিন থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা দেশজুড়ে নতুন আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এদিনে, মুক্তিফৌজ বসন্তপুর সীমান্ত চৌকির দখল নেয়। ১৯ নভেম্বর উকসার দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে মুক্তিবাহিনী। পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে অবস্থান নেয় ইছামতি নদীর পূর্ব পারে। সারারাত লড়াই চলে। শনিবার ঈদের দিন বেলা ১২টার দিকে কালীগঞ্জ থেকে পালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।
জাহানারা ইমাম তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে লিখছেন : ‘আজ ঈদ। ঈদেও কোনো আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারো জামাকাপড় কেনা হয়নি। দরজা জানালার পর্দা কাচা হয়নি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদানী। শরীফ, জামি ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি। কিন্তু আমি খুব ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে! বাবা-মা-ভাই-বোন, কোনো গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়িতে? তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হতে বেড়ে খাওয়াবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য একশিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি।’
রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা যখন জীবনপণ লড়াই করছেন তখন জাহানারা ইমামের মত মায়েরা তাদের প্রতীক্ষায় থেকেছেন। অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদাররাও বসে ছিল না। বসে ছিল না রাজাকাররা। গোলাম আযম ১০ নভেম্বর লাহোরে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানি জনগণ জেহাদি মনোভাব নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হলে আমরা দিল্লি ও কলকাতায় গিয়ে ঈদের নামাজ পড়ব।’
তবে কলকাতায় ঈদের নামাজ হয়েছিল। সেখানে ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ। প্রবাসী সরকারের উদ্যোগে ঈদের নামাজের জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতার থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয় প্রাঙ্গণে ঈদ জামাতের আয়োজন করা হয়েছিল। সে ঈদ জামাতে অংশ নিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, অর্থমন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী এম কামরুজ্জামান, প্রধান সেনাপতি মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, বিমান বাহিনী প্রধান এ কে খন্দকার, অধ্যাপক ইফসুফ আলী প্রমুখ।
‘চরমপত্র’ খ্যাত সাংবাদিক এম আর আখতার মুকুল তার স্মৃতিচারণে সেদিনের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা যখন থিয়েটার রোডে পৌঁছালাম তখন কেবল নামাজ শেষ হয়েছে। তাই প্রায় সবার সঙ্গে কোলাকুলি করলাম। এরপর সবার মুখে অশ্রুভেজা কণ্ঠে কেবল রণাঙ্গন ও ঢাকার আলাপ। প্রতিমুহূর্তে উপলব্ধি করলাম, দৈহিকভাবে আমরা সবাই মুজিবনগরে থাকলেও আমাদের মন-প্রাণ সবই পড়ে রয়েছে দখলিকৃত বাংলাদেশে। আর সেখানকার সব মানুষ তাকিয়ে আছে আমাদের সাফল্যের ওপর। বাঙালি জাতির এ রকম একাত্মতাবোধ আর দেখিনি।’
’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় গেরিলা যুদ্ধ করেছিলেন মাহবুব আলম। তার লেখা ‘গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধে’ গ্রন্থে তিনি জানান, ঈদের দিনের যুদ্ধ করার কাহিনি। তিনি লিখেছেন, একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে এরকমের যে, ঈদের দিন পাক আর্মি ব্যাপকভাবে হামলা করবে সীমান্ত এলাকাগুলোতে। গুজবটা যেভাবেই ছড়াক, যথেষ্ট বিচলিত করে তোলে আমাদের। মুক্তিযোদ্ধারা যখন ঈদের নামাজের জন্য জামাতে দাঁড়াবে ঠিক সে সময়ই নাকি করা হবে এই হামলা! যুদ্ধের মাঠে শত্রুবাহিনীর সম্ভাব্য কোনো তত্পরতাকেই অবিশ্বাস করা যায় না।’ ... ‘সে অনুযায়ী পরিকল্পনাও করে ফেলে সবাই একসঙ্গে বসে। সিদ্ধান্ত হয় ঈদের আগের দিন সব দল দুই ভাগে ভাগ হবে এবং সমবেত হবে দুই জায়গায়। নালাগঞ্জ আর গুয়াবাড়িতে। ছেলেরা তাদের নিজেদের মতো করেই ঈদ উত্সব পালন করবে। তবে নামাজ পড়বে একেবারে সীমান্তের ধার ঘেঁষে। গুয়াবাড়ীতে সমবেত ছেলেরা ভারতীয় সীমান্তে উঁচু গড়ের পাদদেশে গিয়ে জামাত পড়বে। নালাগঞ্জে জামাত হবে আমগাছ তলায় পুকুরের পাড়ে। মুসলমান ছেলেরা যখন ঈদের জামাতে দাঁড়াবে, তখন হিন্দু ছেলেরা কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে হাতিয়ার হাতে সতর্ক প্রহরায় থাকবে। হিন্দু সহযোদ্ধাদের দেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে মুসলমান ছেলেরা নামাজ পড়বে।’
মুুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল নুরুন্নবী খান বীর বিক্রম ছিলেন যুদ্ধরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়মিত বাহিনীতে। তার ‘একাত্তরের ঈদের এই দিনে’ প্রবন্ধ থেকে ঈদের দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আপ্যায়নের বিষয়টি জানা যায়। তিনি লিখেছেন—‘২০ নভেম্বর পবিত্র ঈদের দিনে আমরা আশা করেছিলাম অন্তত এই দিন পাকিস্তানিরা আর্টিলারির গোলা নিক্ষেপ বা সরাসরি আক্রমণ পরিচালনা থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু বাস্তবে ছিল এর বিপরীত দৃশ্য। ঈদের দিন সকাল থেকেই পাকিস্তানিরা আমাদের প্রতিটি অবস্থানেই ব্যাপকভাবে আর্টিলারির গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। আমাদের কোনো অবস্থানেই মুক্তিযোদ্ধারা জামাতের সাহায্যে ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগ পায়নি। তাছাড়া ঈদের দিনে গোসল করা, নতুন জামা-কাপড় পরা বা মিষ্টি-সুজি-সেমাই খাওয়া বা উন্নতমানের খাবারেরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। দুপুরের দিকে দূরবর্তী গ্রাম থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা কিছুটা উন্নতমানের খিচুড়ি নিয়ে এসেছিল। আর্টিলারির গোলাগুলির মধ্যেই খিচুড়ির টুকরিগুলো বিভিন্ন প্রতিরক্ষা অবস্থানে পৌঁছানো হয়।’
