বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের জাতীয় সম্মেলনে বক্তারা
ইত্তেফাক রিপোর্ট
‘গরিব পিতামাতার ঘরে জন্ম আমার। অভাবের কারণে লেখাপড়াও বেশিদূর করতে পারি নাই। বিয়ে করে স্বামীর সংসারে অভাব আর শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে, দেওয়ালে যখন পিঠ ঠেকে গিয়েছিল, তখন হটাত্ই ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক’ এর সন্ধান পাই। একটা প্রশিক্ষণ নিয়ে, মনে শক্তি অর্জন করে কাজে নেমে পড়ি। ভাবি, আমাকে দাঁড়াতেই হবে, শুধু নিজের জন্য নয়, অন্য নারীদেরও সংসারের অবহেলা আর বন্দিদশা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে হবে। নিজে ছোটো থেকে অল্প অল্প করে কাজ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। এখন পরিবারে আমারও সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন করা হয়...’ —এই গল্প কেবল একজন নারীর জীবন বদলের গল্প নয়; বিকশিত নারী নেটওয়ার্কের সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিটি নারীর জীবনের গল্প। তারা তাদের জীবনকে এভাবেই বিকশিত করেছে বলে জানান।
গতকাল আগারগাঁও এলজিইডি ভবন মিলনায়তনে ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক’ এর ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন-২০১৯ এ অংশ নেওয়া নারীরা তাদের সাফল্যের কথা এভাবেই বর্ণনা করেন। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মুক্তির লক্ষ্যে কৌশলগত আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাব্রতী প্রতিষ্ঠান ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’ এই সম্মেলনের আয়োজন করে। ‘নারী নেতৃত্ব বিকশিত কর্মসূচি’ এর আওতাধীন ‘বিকশিত নারী নেটওয়ার্ক’ ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে। দিনব্যাপী সম্মেলনে দেশের ৩১ জেলা থেকে ১২০০ প্রতিনিধি এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। নারী নেত্রীরা বলেন, আমাদের আন্দোলন পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে।
ইউএন উইমেন এর বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ শোকো ইশিকাওয়া তৃণমূল থেকে আসা নারী নেত্রীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের মধ্যে যে রং ও প্রাণশক্তি দেখছি, তা আমাকে সমৃদ্ধ করছে। আপনারা এখানে ১ হাজার ২০০ জন এসেছেন, আপনাদের একেকজনের পেছনে নিশ্চয়ই আরো লাখ নারী যুক্ত আছেন। তিনি বলেন, গত ২৫ বছরে যে কটি দেশ উন্নতি অর্জন করেছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। নারীর শিক্ষা, ক্ষমতায়ন, এসব কিছুতে রোল মডেল বাংলাদেশ। এর পেছনে আপনাদের অবদান রয়েছে।
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এর গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর ক্যাথি বাকি সম্মেলনে যোগ দেওয়া নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের বিভিন্ন জনের নানা রং দেখে আমি অভিভূত। আপনারা একা নন, আপনাদের বড়ো শক্তি আপনাদের একটা নেটওয়ার্ক আছে। এরমধ্য দিয়ে নিজেদের কাজকে বেগবান করতে হবে। আপনাদের মধ্য দিয়েই আসবে পরিবর্তন। আপনারাই পারবেন সব রং ছড়িয়ে দিতে।
দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এর গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নারীরাই ক্ষুধামুক্তির মূল চালিকাশক্তি। নারীরাই উন্নয়নের চাবিকাঠি। এটি শুধু কথার কথা নয়, ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্য। যে সমাজে নারীরা যতবেশি অগ্রসর ও ক্ষমতায়িত সেই দেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ততটাই প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো তার দৃষ্টান্ত। দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বিশ্বাস করে, নারীরা এগিয়ে এলে সমাজে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।
মূল বক্তব্যে দি হাঙ্গার প্রজেক্টের সহসভাপতি নাসিমা আক্তার জলি বলেন, সমাজে নারীদের এমন অবস্থা যে, তারা চাইলে হাসতে পারে না, চাইলে কাঁদতেও পারে না। সেইখানে এমন একটা পরিবর্তন দরকার, যেখানে নারীরা তাদের চিন্তায় ও সিদ্ধান্ত মতো কাজ করতে পারবে। তিনি বলেন, আমরা সেই বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হবে না। আর এ জন্যে তৃণমূলের নারীদের উন্নয়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা সেই জায়গায় কাজ করছি। তিনি বলেন, প্রতিটি পুরুষকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তারা সচেতন হলে, আমাদের সমাজে পরিবর্তন আসবে। দারিদ্য দূর করতে নারীদের ক্ষমতায়িত করতে হবে।
