বাংলাদেশের নদীনালা, খালবিলে ছড়াইয়া পড়া একটি জলজ উদ্ভিদ হইল কচুরিপানা। ইহা দীর্ঘদিন ধরিয়াই সমস্যা সৃষ্টি করিতেছে। ইহার প্রভাবে মৃতপ্রায় হইয়া পড়িয়াছে অনেক নদনদী। কচুরিপানা মুক্তভাবে ভাসমান বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। ইহার আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। কচুরিপানা খুবই দ্রুত বংশবিস্তার করিতে পারে। ইহা প্রচুর পরিমাণে বীজ তৈরি করে যাহা ৩০ বছর পরও অঙ্কুরোদ্গম ঘটাইতে পারে। কচুরিপানার অর্কিড-সদৃশ ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হইয়া এক ব্রাজিলীয় পর্যটক ১৮০০ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলায় কচুরিপানা নিয়া আসেন। তাহার পর ইহা এত দ্রুত বাড়িতে থাকে যে, ১৯২০ সালের মধ্যে বাংলার প্রায় প্রতিটি জলাশয় কচুরিপানায় ভরিয়া যায়। কচুরিপানা নির্মূলে নানা সময়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে; কিন্তু তাহা অপ্রতিরোধ্য হইয়া বারবার প্রকৃতিতে ফিরিয়া আসিয়াছে। সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক সংবাদ মারফত জানা গিয়াছে, পিরোজপুরের কচা নদীতে কচুরিপানার কারণে বেকুটিয়া ফেরি চলাচল চার/পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকিতেছে। ফলে দুর্ভোগে পড়িয়াছেন সাধারণ যাত্রীরা। ইহার ফলে খুলনা-পিরোজপুর-ঝালকাঠি-বরিশাল আঞ্চলিক মহাসড়কে গাড়ি চলাচল বিঘ্নিত হইতেছে। কচা নদীতে ভাসিয়া আসা কচুরিপানা ভাটার টানে ঐ নদীর উপর নির্মাণাধীন সেতুর প্ল্যাটফরমের সহিত আটকাইয়া যায়। আটকাইয়া যাওয়া কচুরিপানার স্তূপ সেতুর প্ল্যাটফরম হইতে শুরু করিয়া বেকুটিয়া ফেরিঘাটের পন্টুন ছাপাইয়া প্রায় ৫০০ মিটার নদীপথ এলাকায় বিস্তৃত হয়। বেকুটিয়া ফেরিঘাটের সামনে কচুরিপানা এমনভাবে আটকাইয়া থাকে যে, ঘাটের পন্টুনে ফেরিযান ও পারাপারকারী যান্ত্রিক খেয়া নৌকা ভিড়িতে পারে না। গত বুধবার ভাটার সময় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার কারণে সকাল ১১টা হইতে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ফেরি চলাচল বন্ধ রাখিতে হয়। পরবর্তী দুই দিনেও এই সংকটের সমাধান হয় নাই। ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় আটকাইয়া থাকার যন্ত্রণা পোহাইতে হইতেছে। কচুরিপানার কারণে শুধু ফেরি চলাচল নহে নৌ চলাচলও বিঘ্নিত হইতেছে।
অনুরূপ সমস্যার সৃষ্টি হইয়াছিল গত শতকের চল্লিশের দশকে। ১৯৩৬ সালে কচুরিপানা আইন জারি করা হয়, যাহার মাধ্যমে বাড়ির আশেপাশে কচুরিপানা রাখা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কচুরিপানা পরিষ্কার অভিযানে অংশ নেওয়াকে নাগরিক কর্তব্য ঘোষণা করা হয়। আক্রান্ত এলাকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটরা তাহাদের নিজ নিজ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী নিয়া কচুরিপানা দমনে কার্যকর অভিযান চালাইতে আদিষ্ট হন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে সকল দলের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাকে কচুরিপানার অভিশাপমুক্ত করার অঙ্গীকার ছিল। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক নির্বাচনে বিজয় লাভ করিয়া তাহার নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে কচুরিপানার বিরুদ্ধে জোরদার অভিযান চালান।
উপরিউক্ত ঘটনাবলি হইতে আমরাও শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারি। বাংলার নদীনালা, খালবিল রক্ষায় সমন্বিত নাগরিক উদ্যোগ গ্রহণে সরকারকেও প্রতিশ্রুতি লইয়া আগাইয়া আসিতে হইবে। আমরা জানি, কৃষিতে কচুরিপানার নানা ব্যবহারও রহিয়াছে; সার হিসাবে ইহা ব্যবহূত হইতে পারে, বর্ষাকালে ভাসমান বীজতলা তৈরিতে ইহা কাজে লাগে। আমাদের কৃষক ভাইদের এই ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন করিয়া তুলিতে হইবে।
