ডক্টর শাহ্ কাওসার মুস্তাফা আবুলউলায়ী
আজ এগার রবিউস সানী, ৮৮০তম ফাতেহায়ে ইয়াযদাহাম-অলিকুল শিরোমণি গাউসুল আযম হযরত শায়খ আবদুল কাদির জিলানী রাহমাতুল্লাহ-এর ইসালে সওয়াব উদ্যাপন দিবস। আল্লাহ্র এই মহান অলি ৪৭০ হিজরি (১০৭৭ খ্রিস্টাব্দ) ইরানের জিলান নামক স্থানে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৫৬১ হিজরিতে (১১৬৬ খ্রিস্টাব্দ) মহান রাব্বুল ইজ্জাতের ডাকে সাড়া দিয়ে বাগদাদ শহরে ইহধাম ত্যাগ করেন। পিতার দিক থেকে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়াসাল্লামের জ্যেষ্ঠ দৌহিত্র সাইয়্যেদেনা ইমাম হাসান আলায়হে সালামের বংশধর এবং মায়ের দিক থেকে তাঁর কনিষ্ঠ দৌহিত্র সাইয়্যেদুশ শুহাদা সাইয়্যেদেনা ইমাম হুসাইন আলায়হে সালামের বংশধর। এজন্যই তিনি আল্-হাসানি ওয়াল-হুসাইনি হিসাবে পরিচিত। বেলায়েতের (আল্লাহর নৈকট্যের) উচ্চতম শিখরে সমাসীন হওয়ায় সারা দুনিয়ায় সূফীমহলে তিনি গাউসুল আযম উপাধিতে অভিহিত এবং এই উপমহাদেশে তিনি হযরত বড়পীর হিসেবেও খ্যাত। তাঁর পিতার নাম আবু সালেহ মুসা জঙ্গীদুস্ত (রহ.) এবং মায়ের নাম সাইয়্যেদা উম্মুল খায়ের ফাতিমা রাহমাতুল্লাহে আলায়হা। তাঁরা উভয়েই উঁচু স্তরের পরহেজগারীর স্বাক্ষর রেখে গেছেন যার বিবরণ বিভিন্ন সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থাদিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বাল্যকালেই শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) এর পিতৃ বিয়োগ ঘটায় স্নেহময়ী মা এবং নানা, সেই সময়কার একজন প্রখ্যাত অলি, হযরত আব্দুল্লাহ সুমায়ী রাহ. এর তত্ত্বাবধানে তাঁর লালনপালন এবং শিক্ষার কাজটি সম্পন্ন হয়।
বাল্যকালেই হযরতের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় এবং জ্ঞান অর্জনের স্পৃহায় তিনি মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সেই সময়কার প্রাণকেন্দ্র বাগদাদে গমন করেন। বাগদাদ পৌঁছে হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) তদানীন্তন মুসলিম বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা-এ-নিযামিয়ায় ভর্তি হন এবং কঠোর পরিশ্রম ও আল্লাহ প্রদত্ত তীক্ষ মেধা শক্তির বদৌলতে অল্প সময়ের মধ্যেই ইলেম শারীয়াত, ইলেম লুগাত, ইলেম ফিক্হ, ইলেম তাফসির, ইলেম কিরাআত, ইলমে তাসাউফসহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পা্লিত্য অর্জন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানার্জনের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) আত্মশুদ্ধির কঠোর পথ অবলম্বন করেন এবং মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ঐকান্তিক প্রত্যাশায় গভীরভাবে ইবাদত ও রিয়াযতে মগ্ন হন। উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ পঁচিশ বছর তাঁর এ অবস্থায় কাটে। বহু বছর ঈশার অযূতে ফজরের নামাজ আদায় করেন। অর্থাত্ সারারাত জেগে মহান রবের ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। কোরআন করীম খতম করা এবং দরুদ শরীফ পাঠ করা ছিল তাঁর নিয়মিত অভ্যাস।
হযরত গাউসুল আযম সেইসব কঠোর থেকে কঠোরতম পরীক্ষায় অত্যন্ত সাফল্যের সাথে কৃতকার্য হয়েছেন। তিনি হযরত আবু সাঈদ মাখ্যুমী (রহ.)-এর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন। হযরত মাখ্যুমী (রহ.) তখন তাঁকে একটি জোব্বা উপহার দিয়ে বললেন, ‘রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম এই পবিত্র জোব্বাটি হযরত আলী কার্রামাল্লাহু ওয়াজহাহুকে দান করেছিলেন, যা তিনি পরে হযরত হাসান বসরী (রহ.) কে দান করেন। জোব্বাটি পর্যায়ক্রমে আমার কাছে পৌঁছায়। আজ আমি এই বরকতময় আমানত তোমাকে দান করলাম’।
শায়খ আবদুল কাদির জিলানী (রহ.) বলেন, ‘এই মহা পবিত্র জোব্বাখানা পরার পর থেকেই নূর-এ-ইলাহী বৃষ্টির মত আমার উপর বর্ষিত হতে থাকে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি আধ্যাত্মিকতার অতি উঁচু মাকামে পৌঁছার কারণেই সারা মুসলিম জাহানে গাউসুল আযম খ্যাতি লাভ করেছেন। তাঁর অসংখ্য কারামত (আল্লাহ প্রদত্ত অলৌকিক ক্ষমতা) বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পেয়েছে। যার ফলে অসংখ্য পথহারা লোক ইসলামের পথে ধাবিত হয়েছেন। নবী এবং অলীআল্লাহগণের কারামাত সত্য, পবিত্র কোরআন মজীদে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। হযরত গাউসুল আযম আল্লাহর হাবীব, সমস্ত নবীগণের সর্দার, হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লামের উম্মতের মধ্যকার অলিগণের শিরোমণি। তিনি কঠোর সাধনা এবং আল্লাহ ও তাঁর হাবীবের প্রতি সীমাহীন আনুগত্যের মাধ্যমেই সেই মাকাম হাসিল করেছিলেন। আল্লাহ্ প্রদত্ত তাঁর আধ্যাত্মিক ফায়েজ এখনো জারি রয়েছে এবং তাঁর ওসিলায় লাখো মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। এটা হল গাউস পাকের প্রতি তাঁর মহান রবের বিশেষ অনুগ্রহ। হযরত গাউসুল আযম (রহ.) শুধু ওয়াজ নসিহতের মধ্যেই তাঁর হেদায়েতের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে উচ্চতর শিক্ষা ও তা’লীম দেয়ার জন্যে বাগদাদে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে অনেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দীন প্রচারের কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেন। হেদায়েতের কার্যাদির ব্যস্ততার মাঝেও হযরত গাউসপাক (রহ.) বেশ কিছু অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ হলো, গুনিয়াতুত তালেবীন, ফাত্হুল গায়েব, ফাতেহ রাব্বানী, সিররুল আসরার, জালালুল খাতির ফিল্ বাতিন ওয়ায্যাহির, কাবিরিয়াত-এ-আহ্সা। এ ছাড়াও তিনি দিওয়ান-এ-গাউসুল আযম এবং কাসায়েদ-এ-গাউসিয়া নামক দু’খানা কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন।
n লেখক : সাজ্জাদাহনাশীন, খানকাহ্ আবুলউলাইয়াহ, কিশোরগঞ্জ।
এবং অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
