সড়কের নিরাপত্তায় প্রতিবন্ধকতা কোথায়?

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৫০

ইয়াছির আরাফাত

যেখানে জীবন আছে, সেখানেই নিরাপত্তা নামক বিষয়টি থাকে। নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের জীবন চক্রের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে সংযুক্ত। অন্ধকারে পথ চলতে গেলে সাপ-বিচ্ছু থেকে নিরাপদ থাকতে টর্চ লাইট ব্যবহার করা হয়। আকাশ পথে ভ্রমণের নিরাপত্তার জন্য ‘প্যারাসুট’, নদীপথে জীবন রক্ষাকারী ‘লাইফ বয়া‘ ব্যবহার করা হয়। প্রশ্ন হলো—যাতায়াতের জন্য সবথেকে সহজ এবং সর্বাধিক ব্যবহূত সড়ক পথে তাহলে নিরাপত্তা সরঞ্জাম কী? যান্ত্রিক ত্রুটি, বিরূপ আবহাওয়া ইত্যাদির কারণে আকাশ পথে বিমান দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে বলেই প্যারাসুট রাখা হয়। নদীপথে পানিতে ডুবে যাতে মৃত্যু না ঘটে সেজন্য ‘লাইফ বয়া’ রাখা হয়; কিন্তু সড়কে না আছে পানিতে ডোবার ভয় আর না আছে হাওয়ায় ভেসে আছড়ে পড়ে মরার ভয়। যদি তাই হয় তাহলে কেন সড়ক পথে জীবন রক্ষার সরঞ্জাম থাকার প্রশ্ন আসবে? প্রশ্নটি খুব সাধারণ হলেও বাস্তবে এটি খুব জটিল প্রশ্ন। কারণ সাধারণ ভাবনায় সড়ক পথ অন্য সব মাধ্যম থেকে নিরাপদ হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাত্ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন। এই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন। সরকারি হিসাবে দেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ২ হাজার ৫০০ মানুষ নিহত হয় এবং আহত হয় প্রায় ২০ হাজার মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২০ হাজারের বেশি মানুষের। সড়ক দুর্ঘটনায় এশিয়ায় বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে এবং বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া তথ্য থেকে এটা স্পষ্টভাবে বলতে পারি সড়ক দুর্ঘটনা মহামারি অপেক্ষা আরো বেশি ভয়ংকর।

মহামারি সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্য কি তাহলে কোনো প্রতিষেধক বা নিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই? অবশ্যই আছে। যানবাহনের ফিটনেস, প্রশিক্ষিত চালক, চালকের বৈধ লাইসেন্স, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কে সাইনবোর্ড ও সংকেত চিহ্ন নির্দেশক বোর্ড, সড়ক পরিবহন আইন, চাহিদা অনুযায়ী রাস্তার প্রশস্ততা ও ডিভাইডার ইত্যাদিকে আমি সড়ক পথের নিরাপত্তা সরঞ্জাম বলছি। তাহলে কী কারণে উল্লেখিত সরঞ্জাম যোগান দেওয়া যাচ্ছে না সে বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া দরকার।

ফিটনেস নবায়ন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই দেশে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩২০টি গাড়ি চলাচল করছে বলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় এটাই, এত বৃহত্সংখ্যক গাড়ি ফিটনেস ছাড়াই চলাচলের পরও বিআরটিএ, পুলিশ প্রশাসন, ট্রাফিক পুলিশ, এমনকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এতদিন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

‘সংকেত চিহ্ন‘ দুর্ঘটনা রোধে বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে; কিন্তু সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের (সওজ) তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৬২ শতাংশ রাস্তায় সাইনবোর্ড ও সংকেত চিহ্ন নির্দেশক বোর্ড নেই। এই বিষয়টি আমলে নিয়ে শতভাগ রাস্তায় সাইনবোর্ড ও সংকেত চিহ্ন নির্দেশক বোর্ড নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

বেশির ভাগ দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও নিয়ন্ত্রণহীন গতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অধিক পরিমাণ যাত্রী বহন করার বিষয়টিও চোখ এড়ায় না সহজে। মালিকদের ব্যবসায়িক ভাবনা ও চালকদের বাড়তি ইনকামের মনোভাব উক্ত সমস্যার মূল কারণ। এ ব্যাপারে চালকদেরকে সচেতন করার জন্য কাউন্সিলিং করা যেতে পারে।

সড়কের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়া। তবে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার যে যথেষ্ট আন্তরিক সেটা ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ পর্যালোচনা করলেই বুঝতে সক্ষম হই; কিন্তু এই আইন বাস্তবায়ন করতে হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পুলিশ প্রশাসন, পরিবহন শ্রমিক নেতা, চালক, মালিক, যাত্রী, পথচারী, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সামাজিক সংগঠনসহ সব মহলকেই আন্তরিক হতে হবে। সড়কের উপনাম মৃত্যুফাঁদ ও আতঙ্ক চিরদিনের জন্য মুছে গিয়ে ‘নিরাপদ সড়ক’ হবে—এই প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট হতে হবে সবাইকে।

n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর