ছেলে অভিজিত্ রায় হত্যার বিচার না দেখেই চলে গেলেন বাবা অজয় রায়। তার পুত্র অভিজিত্ রায় জঙ্গিদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। অধ্যাপক অজয় রায় বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা নিহত অভিজিত্ রায়ের বাবা। তিনি গত ২৮ অক্টোবর আদালতে গিয়ে ছেলে হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। সেই ছেলে হত্যার বিচারের রায় পাওয়ার আগেই পরলোকগমন করলেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক অজয় রায়। মুক্তিযোদ্ধা এ লেখক একাধারে ছিলেন পদার্থ বিজ্ঞানী, বিজ্ঞান লেখক এবং মানবাধিকার কর্মী। অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে ব্লগার-লেখক অভিজিত্ রায় ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির উলটো পাশে জঙ্গিদের হামলায় নিহত হন।
গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত ২৫ নভেম্বর থেকে তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিত্সাধীন ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, চিকিত্সাবিজ্ঞানের গবেষণার জন্য তার মরদেহ বারডেম হাসপাতালে দান করা হবে।
অধ্যাপক অজয় রায়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। এছাড়াও অজয় রায়ের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, জাতীয় পার্টি-জেপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলামসহ বিশিষ্টজনরা। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শোক জানিয়েছে এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।
অধ্যাপক অজয় রায়ের ছোটো ছেলে অনুজিত্ রায় জানান, গত রাতে তার কফিন রাখা হয় বারডেমের হিমঘরে। আজ মঙ্গলবার সকালে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে বেইলি রোডের বাসভবনে। সেখান থেকে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধার জন্য বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হবে। বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান অনুষদে নিয়ে যাওয়া হবে।
২০১২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে একুশে পদক অর্জন করেন অজয় রায়। পদার্থবিদ অজয় রায়ের দুটি গবেষণা নোবেল কমিটিতে আলোচিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অবসরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাম্মানিক শিক্ষকও ছিলেন অজয় রায়। শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক অজয় রায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। পরবর্তী সময়ে নির্মূল কমিটির উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রায় সব গণতান্ত্রিক ও নাগরিক আন্দোলনের সামনের কাতারের মানুষ। দেশি বিদেশি বহু জার্নালে অজয় রায়ের পেপার প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি পদে ছিলেন। তিনি সম্প্রীতি মঞ্চের সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সহসভাপতি এবং এশিয়াটিক সোসাইটির বিজ্ঞান বিভাগের সম্পাদক।
অজয় রায় ১৯৩৫ সালের পহেলা মার্চ দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুল ও কলেজ জীবনে অজয় রায় পড়াশোনা করেছেন দিনাজপুরে। ১৯৫৭ সালে এমএসসি পাস করে যোগ দেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। তিনি ১৯৫৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৭ সালে সেখানেই করেন পোস্ট ডক্টরেট। ১৯৬৭ সালে শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগদান করেন।
