মনীষী

চিত্রশিল্পী রশিদ চৌধুরী

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:৫৯

হিমেল আহমেদ

শুধু চিত্রশিল্পী বললে ভুল হবে—তিনি ছিলেন লেখক, ভাস্কর ও অধ্যাপকও। বাংলাদেশে শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রবর্তিত উত্তর-উপনিবেশিক পর্বে সৃজনশীল ও মৌলিকত্বে রশিদ চৌধুরী ছিলেন সর্বজন প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব। পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের আধুনিক শিল্প-আন্দোলন সূচনার অন্যতম পথিকৃত্ রশিদ চৌধুরীর প্রায় শিল্পকর্মে মানুষের চলমান জীবনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। শিল্পীজীবনের প্রথমাবস্থায়, ছাত্র থাকাকালে তিনি এঁকেছেন প্রধানত জলরং এবং তেলরং মাধ্যমে সাধারণ মেহনতি জন-জীবন এবং শ্রমজীবীদের দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্ম। আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতির বহু উপাদান এবং বিষয়বস্তু যেমন যাত্রাগান, লাঠিখেলা, মোহররমের মাতমদৃশ্য, কৃষ্ণকীর্তন, সর্পপূজা, নববর্ষ উদ্যাপন, রাজা-রানি, সাহেব-মেম, সোনাভানুর পালা ইত্যাদি তাঁর কাজের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। পাশাপাশি লোকচিত্রের বর্ণবৈশিষ্ট্য এবং দ্বিমাত্রিক বিন্যাস, আলোছায়ার উদ্ভাস ও কারিগরিকে একসঙ্গে মেলাবার চেষ্টা চালিয়েছেন। তাঁর চিত্রকর্মে আকাশি নীল, বাদামি, সাদা, কালো, অগ্নিবর্ণ, সবুজ ইত্যাদি রঙের ব্যবহারের আধিক্য নজরে আসে। তিনি গভীরভাবে ফুল এবং গাছপালার মতো বৈচিত্র্যময় জৈব গঠন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর একটি স্বতন্ত্র বার্তা প্রকাশ করতে মূলত প্রগাঢ় জাঁকজমক রঙের ব্যবহার করেছেন, যা বহু বছর ধরে দেশে-বিদেশে শিল্প ভক্তদের প্রভাবিত করেছিল।

শুধু দেশে নয় বহির্বিশ্বেও মহান এই চিত্রশিল্পীর আঁকা ছবি প্রশংসা কুড়িয়েছে। রশিদ চৌধুরী ছিলেন মূলত একজন তাপিশ্রী শিল্পী। উল্লেখযোগ্য তাপিশ্রীর সংগ্রহ রয়েছে বঙ্গভবন, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর, চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজ (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায়। বিদেশে ফ্রান্সের বৈদেশিক মন্ত্রণালয়, ভারতের জাতীয় জাদুঘর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘের মহাসচিব কার্যালয়, মিশরের রাষ্ট্রপতি ভবন, যুগোশ্লাভিয়ায় রাষ্ট্রপতি ভবন, ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন, অস্ট্রেলিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ভবন, মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী ভবন ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি চিত্র রচনা করেছেন তেলরঙে, টেম্পারায়, গোয়াশে এবং জলরঙে। পোড়ামাটিতে ভাস্কর্য ও বিভিন্ন মাধ্যমে ছাপাই চিত্রও তৈরি করেছেন। করেছেন ফ্রেস্কো ও তাপিশ্রী মাধ্যমে অজুরার কাজও। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (১৯৬৪), পাট বিপণন সংস্থা ও বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন (১৯৭৬), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৯), গণভবনের সার্বিক সজ্জার কাজ (১৯৭৩, অসমাপ্ত), ফরাসি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় (১৯৬৩), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (১৯৭৫), ইসলামিক ব্যাংক জেদ্দা (১৯৭৮) ইত্যাদি। জাতীয় সংসদ ভবন এবং ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের জন্য বড়ো আকৃতির তাপিশ্রী এবং টেরাকোটার কাজ ছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান কার্যালয়ে রয়েছে তাঁর টেরাকোটা মুরাল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অনেক বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে। পরবর্তীকালে এই বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণ করা হয় বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ। এর নকশা করেন রশিদ চৌধুরী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে তাঁকে সম্মান জানাতে প্রতিষ্ঠা করা হয় শিল্পী রশিদ চৌধুরী আর্ট গ্যালারি, যেটি চট্টগ্রাম শহরের সর্বপ্রথম আর্ট গ্যালারি হিসেবে গণ্য। দেশ বিদেশে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। একুশে পদক ও জয়নুল আবেদিন পুরস্কারসহ ফ্রান্স, ইরান এবং আমেরিকায় বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতেছেন। 

রশিদ চৌধুরীর কাছে শিল্পকর্ম ছিল প্রেমের মতো। অল্প বয়সে মৃত্যু হয় এই মহান চিত্রশিল্পীর। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার পর ফুসফুসের ক্যান্সারে দেশ-বিদেশে চিকিত্সা নিয়েও ১৯৮৬ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যু বরণ করেন। বাংলাদেশের শিল্পকর্মে তাঁর অবদান অসামান্য।