যাকে ছুঁই সে-ই যায় দীর্ঘ পরবাসে

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৩২

ইনফরমেশন হাইওয়ের এই সময়ে শহুরে নাগরিকরা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ডের ১৬ সংখ্যার মধ্যে যতই নিজেদের আটকে ফেলুক, যতই নাসা বা ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি সৌরশক্তিনির্ভর মঙ্গল যানের খোঁজখবর রাখুক, মানুষ কিন্তু কেবল বিজ্ঞান কিংবা হিসাববিজ্ঞান নয়। মানুষ শেষ পর্যন্ত মানুষই। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে এক নিরীহ অভিমানী মন, যে নাকি স্মৃতির সুবর্ণরেখা ধরে নস্টালজিক হয়ে যায়, বিশেষ করে বছরের এই শেষ সময়ে। পুঁজিতান্ত্রিক এই বিশ্বে পণ্যায়নের যতই প্রসার ঘটুক, মানুষের প্রকৃত তৃষ্ণা কিন্তু ইন্দ্রিয়সুখের কোনো পণ্যের জন্য নয়। শেষ পর্যন্ত মানুষ তাদেরই বেছে নেয়, যারা আত্মার সঙ্গ দিতে পারে। আলুর দাম বিভিন্ন সময়ে ওঠানামা করবে। যখন দাম বাড়বে আমরা ক্ষুব্ধ হব, দাম কমলেই আবার শান্ত হয়ে উঠবে মন; কিন্তু ভ্যান গঁগের আঁকা ‘দ্য পটেটো ইটারস’ চিরকালীন। যখনই লোকে ছবিটি দেখে তখনই মনে পড়ে যায় ছিন্নমূল আলুখোরদের কথা। ভাবুন, একটি পেইন্টিং কতদূর পর্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে, যা দেখে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ দরিদ্র মানুষের জন্য সহানুভূতি অনুভব করে। অভিজন (কুলীন বংশের সম্ভ্রান্ত) নয় এমন শিল্পীই আত্মার প্রকৃত সঙ্গী। এ বছর অনেক আত্মার সঙ্গীকে হারালাম। এমন নয় যে এদের সকলের শারীরিক অবস্থা দীর্ঘদিন ওষুধ বা যন্ত্রনির্ভর ছিল। কারো কারো চলে যাওয়াটা তো একদমই হঠাত্।

সকলেই প্রিয় হতে পারেন না, কেউ কেউ প্রিয় হন। জনারণ্যে কোনো কোনো মানুষকে আলাদা করে চোখে পড়ে, যিনি তার কাজ নিষ্ঠা নিবেদন এমনকি অভিব্যক্তির জন্যও আমাদের প্রিয় হয়ে ওঠেন। তেমনই দুজন শাহনাজ রহমতুল্লাহ, সুবীর নন্দী। সংগীতপ্রেমীদের মনে এ দুজনের জন্য পাতা আছে চিরকালীন এক সুরের আসন। গান তো অনেকেই করেন, জনপ্রিয়তাও পেয়ে যান। তবে গায়নশৈলী গীতিসত্তা সর্বোপরি মেধা দিয়ে শ্রোতাদের মনে স্থায়ী পরিসর গড়ে তোলা সত্যিই কঠিন। এ দুজন তা পেরেছিলেন। দুজনই যেন জীবনের সমগ্র উদ্যম ও সামর্থ্য ঢেলে দিয়েছিলেন সংগীতে। আরো দুর্ভাগ্য, এখনো সংগীত ভুবনের অন্তত দুজন জীবন্ত কিংবদন্তি আলাউদ্দিন আলী, এন্ড্রু কিশোর আছেন হাসপাতালে। তাদের জন্য যতটুকু করণীয় ছিল করছে কি তা বাংলাদেশ? ভেবে দেখুন, একটি ভালো সৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকে কত ‘মহাজনের’ কত প্রত্যাখ্যান, কত অপমান, কত ‘না’। প্রকাশক শোনান, ভাই, বাজার দিন দিন কঠিন হচ্ছে, কাগজের দামও আকাশছোঁয়া; তাছাড়া কয় কপি বই-ই বা...! অডিও প্রকাশকের কর্ণধার বলেন, ইউটিউবের বরাতে অ্যালবামের কপালে মড়ক লেগেছে, ও তো কেউ কেনেই না। আর সিনেমা হলগুলি তো পরিণত হয়েছে সুপার মার্কেটে, তাই চলচ্চিত্র-দর্শক নাই অজুহাত দিতেই পারেন পরিবেশক। পাঠক নেই, শ্রোতা নেই, দর্শক নেই, তাই রয়্যালিটিও নেই! তবে কি কবি শিল্পী চলচ্চিত্রকাররা ঘাস খেয়ে বাঁচবেন? প্রায় তেমন পরামর্শই দেন বাজার নিয়ন্ত্রকরা। না, একেবারে খালি হাতে ফিরে যান না তারা। মৃত্যুর পর বরাদ্দ থাকে ‘সালাম’ অথবা ‘গোটা দেশ কাঁদছে আপনার জন্য’ বা ‘...এ ক্ষতি পূরণ হবার নয়’ জাতীয় বাক্য। চ্যানেলে চ্যানেলে আধ ঘণ্টার স্মরণ আয়োজন, নাগরিক শোকসভা, সাহিত্য বা বিনোদন পাতায় এক্সক্লুসিভ ট্রিটমেন্ট। ভাগ্য প্রসন্ন থাকলে জুটে যেতে পারে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত হবার ব্যবস্থাও। তারপর? তারপর ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায় শিল্পীর ন্যায্য পাওনার হিসাব, তার সৃষ্টি সংরক্ষণের উদ্যোগ, পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তিন দিনের এই সম্মান সমাদর আর সারা জীবনের অবহেলা দেখতে কোন পরিবার চাইবে তার সন্তান শিল্পী হোক? শিল্পী কারখানায় তৈরি হওয়ার জিনিস নয় ঠিক, কিন্তু এও ঠিক শিল্পীজীবনের এই করুণ পরিণতি দেখে, কোনো শিশুর মধ্যে শিল্পের প্রতি অনুরাগ দেখলে অভিভাবকরা প্রাণ দিয়ে প্রতিরোধ করেন শিল্পসাধনার প্রতি কিংবা অনুরাগের প্রতি আসক্তি।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রাচ্য মার্গসংগীতকে পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে ফিউশন। এটা ফিউশন না কনফিউশন তা নিয়ে বিতর্কে যাচ্ছি না। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য এই দুই ভিন্ন ঘরানার মধ্যে এই জাতীয় সংগীত সেতু না বিচ্ছিন্নতা (অ্যালিয়েনেশন) তৈরি করছে সে তর্কেও যাব না। সেতার বা সরোদের সঙ্গে অক্টোপ্যাডের বিচিত্র ব্যবহার চলে কি না কিংবা সেটাই সংগীতকে সাধারণের কাছে পৌঁছে দেবে কি না—এ নিয়েও কোনো যুক্তি দেখাতে চাইছি না। প্রায়ই অভিযোগ ওঠে নতুন প্রজন্মের কাছে ধ্রুপদি রবীন্দ্র নজরুলসংগীত পৌঁছুতে পারছে না সহজ মেজাজ না থাকার কারণে। রাগসংগীতের সঙ্গে চটুল সুর মিশিয়ে ফিউশন তৈরির প্রবণতা এইসব উচ্চাঙ্গ মার্গের সংগীতের গভীরতাকে ক্ষুণ্ন করে কি না, বিশুদ্ধতাকে অশুদ্ধ করে কি না, সে প্রশ্নও তুলছি না। যে রাগ সরোদে ঝংকার তুলতে পারে, গিটারে তাকে বিদ্রুপের মতো শোনায় এমন গানই যে চারপাশে শুনছি, শুনতে শুনতে কান পচে যাওয়ার দশা হয়েছে সে অভিযোগও আজ করব না। শুধু বলতে চাই, যারা সংগীতকে সাধনা, উপাসনার মর্যাদা দিয়ে জীবন ক্ষয় করে ফেলেছেন জাতি যেন তাদের যথাযথ মর্যাদা দেয় জীবদ্দশাতেই।

n লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক