প্রতিবার অগ্নিকাণ্ডের পর কমিটি ফলাফল শূন্য

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:৫৪

রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে প্রায়ই আগুন লাগছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে কেমিক্যাল গুদামে, গার্মেন্টস কারখানায়, বড়ো বড়ো শপিং কমপ্লেক্স, সাধারণ মার্কেট, ফ্ল্যাট বাড়ি, এমনকি বস্তিতেও। জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে মানুষ। বিনষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ। বিশেষ করে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউনে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আতঙ্কিত পুরান ঢাকার লাখো মানুষ। চরম অনিশ্চয়তার মাঝে কাটছে তাদের জীবন। পথে বসছে হাজারো পরিবার। কত স্বপ্ন পুড়ে ছাই হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি গঠন হয়। কিন্তু ফলাফল শূন্য। কোনো কমিটির রিপোর্ট বাস্তবায়ন হয় না।  একের পর এক অগ্নিকাণ্ড থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

২০১০ সালের ৩ জুন এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুরান ঢাকার     নিমতলীর ১২৪ জন মানুষ প্রাণ হারান। দগ্ধ হন অর্ধশতাধিক। পুড়ে যায় ২৩টি বসতবাড়ি, দোকানপাট ও কারখানা। নিমতলী এলাকার একটি বাড়ির নিচতলায় অবৈধ কেমিক্যাল গোডাউন থেকে মূলত ছিল ওই আগুনের সূত্রপাত। মর্মান্তিক ওই ঘটনার পর শুরু হয় পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড আর সরকারের বিভিন্ন বিভাগের দৌড়ঝাঁপ। তদন্ত কমিটি গঠন হয়। কিন্তু সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। নিমতলী ট্র্যাজেডি আজও দেশবাসীকে কাঁদায়। এরপর একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

সর্বশেষ বুধবার ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা ১৩-তে পৌঁছেছে। তাদের মধ্যে এক জন ঘটনাস্থলে আর ১২ জন হাসপাতালে মারা গেছেন। চিকিত্সকেরা বলছেন, দগ্ধ লোকজনের মধ্যে অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জানা গেছে, কারখানাটিতে বিরিয়ানির প্লেট, প্যাকেট ও একবার ব্যবহার উপযোগী (ওয়ান টাইম ইউজ) গ্লাস তৈরি করা হয়। পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম কারখানাটির মালিক। কারখানায় কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২০০। যে ইউনিটে আগুন লাগে, সেখানে ৮০ জন কর্মরত ছিলেন।

এর আগে চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় আগুন লেগে ৭০ জনের মৃত্যু হয়। চুড়িহাট্টার বৃহত্ ভবন ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় মজুতকৃত রাসায়নিক পদার্থে বিস্ফোরণে আগুন লাগে। পুড়ে অঙ্গার হয় ৭৯ তরতাজা প্রাণ। গুরুতর আহত হয় ৪১ জন। সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া পাঁচটি ভবনের একটি ওয়াহেদ ম্যানশনের বেসমেন্টে ছিল ড্রাম ও বস্তাভর্তি ১১ ধরনের কেমিক্যালের মজুত। ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর টাম্পাকো প্যাকেজিং ফ্যাক্টরিতে আগুনে নিহত হন ২৪ জন। এ দুটি ঘটনার পরও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সুপারিশ বাস্তবায়নে একটিও আলোর মুখ দেখেনি। এদিকে পুরান ঢাকায় অবস্থিত এ ধরনের কারখানা বা রাসায়নিক গুদামের অগ্নিকাণ্ডের বিগত দিনের ইতিহাস বড়োই করুণ। পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেওয়ার জন্য একাধিক কমিটি গঠন হয়। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বিভিন্ন সভায় বলেছিলেন, পুরান ঢাকায় কোনো কেমিক্যালের গোডাউন থাকবে না। এসব কঠোর নির্দেশনার পরও দুই-একটা গোডাউন সরলেও প্রায় সব গোডাউন এখনো একই জায়গায় রয়েছে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ৪৫টি ওষুধ মার্কেট রয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার ওষুধের দোকানের গোডাউন আছে প্রায় আট হাজার। এসব গোডাউনের অনেকগুলোতেই ড্রামভর্তি রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ এবং ফসফরাস জাতীয় দ্রব্য রয়েছে। এমনকি অনেক বাড়ির মালিক বেশি ভাড়ার লোভে বাসার নিচতলায় রাসায়নিক পদার্থ মজুতের জন্য ভাড়া দেন। অনেক বসতবাড়ির নিচতলা বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক দাহ্য রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বেশির ভাগ গুদামে মজুত থাকে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, জুতার সোল তৈরির কেমিক্যাল, এডহেসিভ ও পেস্টিং সলিউশন। এসব কারখানা ও গুদামের বেশির ভাগেরই পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, শ্রম অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস বা ডিডিসির ছাড়পত্র নেই।

২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সময় বেঁধে সরকার ব্যবসায়ীদের সব রাসায়নিক দোকান ও গুদাম অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০১১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে ঢাকা মহানগরের আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ ব্যাপারে একটি টেকনিক্যাল কমিটিও গঠন করা হয়। ২০১৪ সালের মধ্যে কেরানীগঞ্জে ২০ একর জমির ওপর রাসায়নিক পল্লী স্থাপনের সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তব রূপ নেয়নি। এ পল্লীতে ১৭টি ভবনে ১ হাজার ৭৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঝুঁকিমুক্তভাবে কার্যক্রম পরিচালনার কথা ছিল। পুরান ঢাকার সব রাসায়নিক কারখানা, গুদাম ও দোকান উচ্ছেদ এবং সব ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য উত্পাদন, বিপণন, গুদামজাতকরণ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সরকারের নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, রাসায়নিক দ্রব্যের জন্য শহরতলীতে পৃথক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী লাল-হলুদ বিপদ সংকেতযুক্ত সাইনবোর্ড প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করাসহ হোল্ডিংয়ে লোকজন বসবাস নিষিদ্ধ ঘোষণারও সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এসবের কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি।