বিএনপি এখন কী করবে

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:৫৬

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে খারিজ হওয়ার পর দলের নেতাকর্মীরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। জামিন না পাওয়ায় বিএনপি এখন কী করবে, তা নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা আনুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা করছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আন্দোলনের কৌশল ও আইনি লড়াই নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দলটি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে না পারলেও একাধিক নেতা জানান, ধাপে ধাপে কঠোর আন্দোলনে যেতে চায় দলটি। তবে তার আগে বিএনপির দুই জোট ২০ দল এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নেওয়া হবে জেলা নেতাদের মতামতও।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে আগামী রবিবার সারাদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল    করবে বিএনপি। একই দিন ঢাকায় দুপুর ২টার পর প্রতিটি থানায় সমাবেশ ও মিছিল করা হবে। তিনি বলেন, জনগণের সক্রিয় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে নতুন নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করা হবে।

 বিএনপির শীর্ষ নেতারা গত কয়েক দিন যাবত্ বলে আসছিলেন, বেগম জিয়ার জামিন না হলে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন শুরু করবেন তারা। কোনো কোনো নেতা স্বেচ্ছায় গণকারাবরণ কর্মসূচির পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। দলের মহাসচিব বলেন, এখন থেকে আর সমাবেশ-বিক্ষোভের জন্য পুলিশের অনুমতি নেওয়া হবে না। তবে দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আপিল খারিজের পর এখনই বড়ো কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামা নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে দ্বিধা আছে। মাঠে নামার পর সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, সে বিষয়গুলো হিসাবে নিচ্ছেন নীতিনির্ধারকেরা। আবার সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় শর্তসাপেক্ষে জামিনের ব্যাপারেও দলের নেতাদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তবে মুখে আন্দোলনের কথা বলা হলেও কার্যত দলে সে ধরনের কোনো প্রস্তুতি নেই।

দলের একজন সিনিয়র নেতা ইত্তেফাককে বলেন, গত ২৬ নভেম্বর হাইকোর্টের সামনে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আকস্মিক বিক্ষোভ ও গাড়ি ভাঙচুরের পর থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সাতটি মামলায় মির্জা ফখরুলসহ প্রায় ৮০০ নেতাকর্মীর নামে মামলা হয়েছে। গতকালও মির্জা ফখরুল, রুহুল কবির রিজভীসহ ১৩৫ জন নেতার নামে শাহবাগ থানায় নাশকতার মামলা হয়েছে দুটি। তাই তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন চাইলেও সিনিয়র নেতারা গ্রেফতারের ভয়ে আপাতত বড়ো আন্দোলনে যেতে চাইছেন না বলে তার অনুমান। তাই ধাপে ধাপে সরকার পতনের আন্দোলন তুঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। একই সঙ্গে আইনগত লড়াইও অব্যাহত রাখবে দলটি। গতকাল জামিন আবেদন খারিজ হওয়ার পর রাজধানীর স্থানে স্থানে বিএনপির ব্যাপক শো-ডাউন ও  বিক্ষোভ প্রদর্শন কর্মসূচি থাকলেও তা কার্যত হয়নি। কারণ হিসেবে  দলের নেতারা বলছেন, পুলিশ সকাল থেকে বিএনপির নয়া পল্টন অফিস অবরুদ্ধ করে রাখে। প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা মিছিলে বাধা দেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বাংলামোটর, সোবহানবাগ, কমলাপুর, পান্থপথ, মৌচাকসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ঝটিকা মিছিল করে জানান হয়।

বিএনপি এখন কী করবে—এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘সরকারের হস্তক্ষেপে স্বাভাবিক জামিন দেওয়া হলো না। এখন তো আমাদের পথ একটাই—আন্দোলন। বাধ্য হয়ে আমরা আন্দোলনের কথা ভাবছি। এই সরকারের পতন ঘটাতে না পারলে বেগম জিয়ার মুক্তি মিলবে না। জনগণ তার ভোটাধিকার ফিরে পাবে না।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশে যদি আইনের শাসন থাকত তাহলে বেগম জিয়া নিশ্চিত জামিন পেতেন। উনি সুবিচার পাননি। তাই বাংলাদেশের মানুষ খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের যে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে, সেটাই করবে। আমরা এখন জনগণকে নিয়ে তার মুক্তি আন্দোলন শুরু করব।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘৭৫ বছর বয়সি গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়া যদি আপসহীনভাবে কারাগারে থাকতে পারেন, আমাদের তো কারাগারে যেতে কোনো আপত্তি নেই। সবাই যদি কারাগারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হবে।’

খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। তার পরও আমরা আইনগতভাবেই লড়াই চালিয়ে যাব।’

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছি। নেতাকর্মীদের এখন আর ঘরে বসে থাকলে চলবে না। তাকে কারামুক্ত করতে সকল বাধা উপেক্ষা করে রাস্তায় নামতে হবে।’

এদিকে গতকাল রাতে গুলশান কার্যালয়ে সিনিয়র নেতা এবং খালেদা আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠকে লন্ডন থেকে স্কাইপের মাধ্যমে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান চৌধুরী টুকুসহ সিনিয়র নেতা ও বেগম জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনও উপস্থিত ছিলেন।