আহমেদ সাঈদ বুলবুল, যশোর অফিস
নতুন সড়ক আইন কার্যকর হওয়ার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কের জেলা যশোরে কোনো ধরনের তত্পরতা শুরু করেনি পুলিশ-প্রশাসন-বিআরটিএ। ‘ধীরে চলো’ নীতির সুবিধা নিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন ৪ হাজারের বেশি চালক চালাচ্ছেন ভারী ও মাঝারি যানবাহন। আর প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই চলছে ফিটনেসবিহীন প্রায় ৫ হাজার বাস ও ট্রাক। এতে সড়ক দুর্ঘটনা আর প্রাণহানি নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বিআরটিএ যশোরের সহকারী পরিচালক কাজী মো. মুরছালিন ইত্তেফাককে বলেন, ফিটনেসবিহীন ৪ হাজার ৮২৪টি বাস-মিনিবাস-ট্রাকের তালিকা পুলিশ সুপারের কাছে দিয়েছি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার মোবাইল কল রিসিভ না করায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা মো. শাহীন বলেন, আনফিট অনেক গাড়ি আছে, এটা স্বীকার করছি। ফিটনেসবিহীন গাড়ির ব্যাপারে আমরা ‘স্লো মোশনে’ চলছি। আর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আবুল লাইছ বলেন, বিআরটিএর পক্ষ থেকে এসপিকে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তার কপি আমরা পেয়েছি। তবে নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর এখনো আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা শুরু করিনি।
বাংলাদেশ সড়ক ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) যশোর কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলার বিভিন্ন সড়কে নিবন্ধিত ভারী ও মাঝারি (বাস-মিনিবাস, ট্রাক-ট্রাক্টর-ট্যাংকলরি) যানবাহন চলাচল করে ১৩ হাজার ১৩১টি। এর মধ্যে রুট পারমিট বা চলাচলের বৈধতা রয়েছে ৮ হাজার ৩০৭টির। রুট পারমিট নেই ৪ হাজার ৮২৪টি গাড়ির। রুট পারমিটবিহীন এসব গাড়ি সড়ক-মহাসড়কে নামানো হয়েছে জোড়াতালি দিয়ে। এসব গাড়ি বাইরে রঙ করা হলেও ভিতরের অবস্থা ভীষণ নাজুক। বাসের পাশাপাশি যশোরে ৯ হাজার ৯৫৮টি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ট্যাংক লরি ও টিপার (মাটি টানা গাড়ি) চলাচল করে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫৪৪টি গাড়ি চলাচলের বৈধতা নেই। আর জেলায় ১৩ হাজার ১৩১ জন পেশাদার চালকের মধ্যে ৮ হাজার ৮২৩ জনের ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন ৪ হাজার ৩০৮ জন।
বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ জানায়, জেলায় ৩ হাজার ২০২টি বাস-মিনিবাস চলাচল করছে। এর মধ্যে ২৮০টি বাসের চলাচলের বৈধতা বা রুট পারমিট নেই। এ বিষয়ে যশোর জেলা বাসমালিক সমিতির সভাপতি আলী আকবর বলেন, যেসব গাড়ির ফিটনেস নেই, সেসব বাসের মালিকদের বার বার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা রুট পারমিট নবায়ন করছেন না। তিনি বলেন, বাস্তবতা হলো, অনেক মালিকই ১০-১৫ বছর ধরে গাড়ির ফিটনেস লাইসেন্স নবায়ন করেননি। এ অবস্থায় জরিমানার পরিমাণ অনেক জমে গেছে। ফলে তারা ফিটনেস লাইসেন্স নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার বিষয়ে যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোর্ত্তজা হোসেন বলেন, চালকরা সবাই ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে চায়। তাদের লাইসেন্স করার আগ্রহ বেড়েছে অনেক। কিন্তু বিআরটিএ লাইসেন্স প্রক্রিয়া অনেক জটিল করে রেখেছে। প্রক্রিয়া সহজ করে শ্রমিকদের সহযোগিতা করলে ভালো হয়।
বিআরটিএ যশোরের সহকারী পরিচালক কাজী মো. মুরছালিন জানান, ১ নভেম্বর নতুন সড়ক আইন কার্যকর হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়টি ১৭ নভেম্বর তপশিলভুক্ত হয়েছে। তিনি আরো জানান, ১১ ডিসেম্বর তিনি নতুন এক প্রজ্ঞাপন পেয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে কোনো জেলার যে কোনো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন যে কোনো সাকেলে করা যাবে।
মাদারীপুর-যশোর হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোল্লা মো. শাহীন জানান, নতুন সড়ক আইন কার্যকর করতে এখনো অনেক সময় লাগবে। আমরা বর্তমানে সচেতনতার কার্যক্রম চালাচ্ছি। মালিক-শ্রমিকদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে তারা সব ঠিকঠাক করে নেবেন। আর এনফোর্সমেন্টের অর্ডার আসলেই তবে আমরা অ্যাকশনে নামব। তিনি আরো জানান, নতুন প্রযুক্তির আরএফআইডি মেশিনের সাহায্যে আমরা গাড়ির নাম্বার প্লেটে ধরলেই তা স্ক্যান হয়ে যাচ্ছে। এতে ঐ গাড়ির যাবতীয় তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এটা এ অঞ্চলের আটটি হাইওয়ে ফাঁড়ির পুলিশ প্রয়োগ করছে। এতেও অনেক সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে।
