বেগমগঞ্জের কালাপোল
চৌমুহনী (নোয়াখালী) সংবাদদাতা
৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী নিরীহ লোকজনকে ধরে এনে দিনভর নির্যাতনের পর সন্ধ্যায় বেগমগঞ্জের কালাপোলের ওপর নিয়ে হত্যা করে লাশ খালে ফেলে দিত। ৪৮ বছরেও উক্ত স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি বা কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি।
৭১-এর হত্যাযজ্ঞের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে বেগমগঞ্জের কালাপোল। বেগমগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবুল হোসেন বাঙ্গালি, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মন্নান, শহিদ পরিবারের সদস্য অ্যাডভোকেট এ বি এম ফারুকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ৭১ সালের ২২ এপ্রিল পাকবাহিনী ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে মেজর বোখারির নেতৃত্বে লাকসাম থেকে পায়ে হেঁটে চৌমুহনী আসার মুহূর্তে সড়কের দুই পাশের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং চৌমুহনী শহরের নিকটবর্তী গ্রাম গনিপুরে হারিছ নামে একজন মিরওয়ারিশপুরে ফরিদ আহমদ ও তার ছেলে এবং রেল স্টেশনের পাশে চার জনকে গুলি করে হত্যা করে। এ ছাড়া চৌমুহনী শহরের হিন্দু অধ্যুষিত কুরী পাড়াসহ বেশ কয়েক স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাকিস্তানি বাহিনী শহরের চৌরাস্তায় অবস্থিত সরকারি কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্যাম্প স্থাপন করে। ২৫ এপ্রিল কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে আগত ব্রিগেডিয়ার আসলামের উপস্থিতিতে রেল স্টেশনে আমান সভা করে রাজাকার বাহিনী গঠন করে।
চৌমুহনী শহরের কলেজ রোডস্থ বিসমোজিম কোম্পানির বিল্ডিং, করিমপুর রোডস্থ কালীবাবুর গ্যারেজ ও দক্ষিণ বাজার খোকা মিয়ার বিল্ডিংয়ে তিন জন কমান্ডারের নেতৃত্বে তিনটি রাজাকার বাহিনী ও কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থিত পাকিস্তানি বাহিনী নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন এলাকায় হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং নিরীহ লোকজনকে ধরে কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ের টর্চার সেলে নিয়ে দিনভর নির্যাতনের পর সন্ধ্যায় চৌরাস্তাসংলগ্ন উত্তরে অবস্থিত কালাপোলের ওপর নিয়ে গুলি করে লাশ খালে ফেলে দিত।
এ কালাপোলের ওপর অসংখ্য নিরীহ লোক হত্যা করে লাশ খালে ফেলে দেওয়া ছাড়াও যেসব নারী নির্যাতনে মারা যেত তাদের লাশ বিদ্যালয়ের উত্তরের সীমানা দেওয়ালের ভিতর মাটিচাপা দিত। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের হত্যাযজ্ঞের ঘটনা শুধু কালাপোল নয়, বেগমগঞ্জের ফেনাঘাটা (আমিনবাজার সংলগ্ন) ২৭ এপ্রিল ১২ জন, জিরতলী (দমদমা দিঘির পাড়) ১৬ জন, আমানাতপুর (কমলা দিঘির সংলগ্ন) স্থানে ১৩ জন, ১৯ আগস্ট গোপালপুর বাজারে ৫৪ জনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এছাড়া রাজগঞ্জ , জমিদারহাট এলাকায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। চৌমুহনী শহরের করিমপুর রোডে কালীবাবুর গ্যারেজে চলে প্রতিদিন হত্যাযজ্ঞ।
এলাকাবাসী এসব হত্যাযজ্ঞের কাহিনী মনে পড়লে আজও আঁতকে ওঠে। বিভিন্ন সময় অনেকে বেগমগঞ্জ কালাপোল এলাকা পরিদর্শন করে এ স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে ঘোষণা করার কথা বললেও দীর্ঘ ৪৮ বছরে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
