আলোকপাত

দেশের ওষুধশিল্পের সোনালি ভবিষ্যত্

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৩৪

আবুল কাসেম ভূঁইয়া

এ দেশের ওষুধশিল্প বিশ্ববাজারে সমাদৃত হচ্ছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে ওষুধশিল্প প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় এসে পড়বে। বর্তমানে আমাদের উত্পাদিত ওষুধ দেশের ৯৮ শতাংশ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। দেশের ৪৬টি ওষুধ প্রতিষ্ঠানের ৩০০টি আইটেমের ওষুধ ১৬০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ দেশের ওষুধের গুণমানের কারণে আরো ১৫০টি দেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, গত কয়েক বছরে এ দেশের ওষুধশিল্পের রপ্তানি আয় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানিতে আমাদের আয় হয়েছে ৮ কোটি ২৮ লাখ ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ কোটি ডলার, আর রপ্তানি হয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এর ফলে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

 বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সূচনালগ্ন ছিল খুবই করুণ। কারণ, স্বাধীনতার আগে এখানকার ওষুধশিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় পর্যায়ে মাত্র ২০ শতাংশ চাহিদা মেটাত। বাকি ৮০ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ দেশে ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেয়। তখন হাঙ্গেরি থেকে ওষুধ এনে দেশের চাহিদা মেটানো হতো। এ দিকে দেশে ধীরে ধীরে ওষুধশিল্প গড়ে উঠতে থাকে। মাত্র একদশকের মধ্যে দেশের ওষুধসংকট কেটে যায়। বর্তমানে দেশে ২৫৭টি ওষুধ কোম্পানিতে ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ তৈরি হচ্ছে। বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার ওষুধ এবং কাঁচামাল উত্পাদিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এই শিল্পে প্রায় ২ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আমাদের ওষুধশিল্প স্বল্প সময়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ায় শিল্পোদ্যোক্তরা বেশ আশাবাদী।

 ২০২১ সাল নাগাদ ওষুধ রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় ১০০ গুণ বেড়ে ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের ওষুধশিল্পের অগ্রগতির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। ওষুধের কাঁচামাল উত্পাদনকারী কোম্পানিকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত শুল্ক মওকুফের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এর ফলে ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে ২০ শতাংশ শুল্ক ছাড় পাবে আমদানিকারকরা। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বিএএসএস) সূত্র মতে, দেশে  ওষুধের কাঁচামাল উত্পাদনের জন্য ঢাকার মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় গড়ে তোলা হচ্ছে প্রথম ওষুধ শিল্প পার্ক অ্যাকটিভ ফার্মাসিটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই)। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এটি পুরোদমে উত্পাদন কার্যক্রম শুরু করবে। এরই মধ্যে ২৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪২টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানে ওষুধের কাঁচামাল উত্পাদন করা হবে।

 এদিকে বাংলাদেশের ফার্মাসিটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উত্কৃষ্টমানের ওষুধ উত্পাদন করে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ওষুধ রপ্তানিতে বাংলাদেশ ১ নম্বর দেশে পরিণত হবে। বাংলাদেশে উত্পাদিত ওষুধ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ওষুধের তুলনায় মূল্য কম হওয়ায় ক্রেতারা আমাদের দেশের ওষুধকে বেশি গুরুত্ব দেন। আমাদের এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে হবে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে আরো জানা যায়, সম্প্রতি তুরস্ক, কুয়েত, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা বাংলাদেশ থেকে ওষুধ আমদানির চুক্তি করেছে। একই সঙ্গে খুব শিগিগরই জাপানেও বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি করা হবে বলে জানা গেছে। এ দেশের ওষুধশিল্পের যে অপার সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা যদি যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে আমাদের দেশ ওষুধ উত্পাদনে পৃথিবীর ১ নম্বর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। রপ্তানি আয় বেড়ে গিয়ে দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটাবে। ওষুধশিল্পের ব্যাপারে সরকার যতটুকু আন্তরিক, আমরা আশা করি তা যেন অব্যাহত থাকে। আমরা চাই, এ দেশের ওষুধশিল্প পৃথিবীর বুকে আরো মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।

n লেখক :বীমা কর্মকর্তা