দেশে প্রতারণার ধরন বদলেছে, বেড়েছে মাত্রা। প্রতিনিয়ত মানুষ সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে। প্রতারকরা কখনো জিনের বাদশা সেজে, কখনো ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে প্রতারণা করছে। এছাড়া অনলাইনে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে নারীর। আবার কখনো রাইড শেয়ারিংসহ নানা কৌশলে প্রতারণা করা হচ্ছে। তবে প্রতারণার শিকার অনেকেই থানায় যান না। ফলে অনেক ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে।
সিআইডির অরগানাইজড ক্রাইমের অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান বলেন, কিছু অসত্ ব্যক্তি তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করছে। যার ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে। অথচ একটু সচেতনতা এবং বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগ করে প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রতারণা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগসহ বিভিন্ন থানায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে সূত্রাপুর থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলীর। অসংখ্য চাঞ্চল্যকর মামলা তদন্ত করেছেন। তিনি বলেন, প্রচলিত অপরাধ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দস্যুতা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় কমেছে। কিন্তু বেড়েছে সাইবার অপরাধ। ডিএমপির অতীত অপরাধ পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় প্রতিদিন গড়ে ছিনতাই, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, দস্যুতার ঘটনায় গড়ে মামলা হতো ৩০ থেকে ৫০টি। এখন সারা মাসে ১০ থেকে ১৫টি মামলা হচ্ছে। কাজী ওয়াজেদ আলী আরো বলেন, আগে ডিজিটাল অপরাধ করে অপরাধীরা পার পেয়ে যেত। কিন্তু পুলিশের সাইবার ইউনিট তৈরি হওয়ার পর অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে।
অপরদিকে পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যে হারে সাইবার অপরাধ বেড়েছে তার জন্য সাইবার ক্রাইমের জন্য রাজধানীতে বিশেষ থানা হওয়া প্রয়োজন। ঢাকায় একমাত্র সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল আদালত অবস্থিত। এ আদালত দেশের বিভাগীয় শহরে সম্প্রসারিত হলে সাইবার অ্যাক্টে দায়ের করা মামলার বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন হবে। সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার শারমিন জাহান বলেন, সিআইডির সাইবার মনিটরিং সেল অনলাইনে সংগঠিত যে কোনো অপরাধ আইনের আওতায় আনতে কাজ করে যাচ্ছে।
জিনের বাদশা
সম্প্রতি জিনের বাদশাহ পরিচয় দিয়ে প্রতারণার দায়ে সিআইডি সাত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। সিআইডির অরগানাইজড ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) মোস্তফা কামাল জানান, জাহানারা বেগম (ছদ্মনাম) অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। চলতি বছরের মাঝামাঝি একটি বিজ্ঞাপন দেখেন। সেখানে বলা হয়, আপনার যে কোনো সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে ‘জীনের বাদশাহ্’। বিজ্ঞাপনে দেওয়া মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে জাহানারা বেগমকে জানানো হয়, ২০০১ টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। তিনি সেটা করার পর একজন তাকে ফোন করে বলেন ‘দরবেশ হুজুর’ তার সঙ্গে কথা বলবেন এবং ‘জিনের বাদশাহ’কে ব্যবহার করে তার মনোবাসনা পূরণ করবেন। এভাবেই শুরু। এর পরের কয়েক মাসে ‘জীনের বাদশাহ্’ জাহানারা বেগমের সঙ্গে নিয়মিত কথাবার্তা চালাতে থাকেন। একপর্যায়ে জাহানারা বেগমকে বলা হয় ‘জিনের বাদশাহ্’ তার প্রতি সদয় হয়েছে এবং তার সঞ্চয়ের টাকা দ্বিগুণ করে দিতে রাজি হয়েছে। এরপর গত পহেলা জুন থেকে পহেলা অক্টোবর পর্যন্ত জাহানারা বেগম মোট ২৫ লাখ টাকা তুলে দেন কথিত ঐ ‘জিনের বাদশাহ্’র হাতে। আর এই কাজে বিকাশের মোট সাতটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়। এই টাকা ছিল জাহানারা বেগমের সারা জীবনের সঞ্চয়। তার কাছে রাখা কিছু সঞ্চয়পত্রও তিনি ভাঙিয়ে নেন। শুধু তাই না, ‘জীনের বাদশাহ্’কে দেওয়ার জন্য তিনি তার এক প্রতিবেশীর কাছে ঋণের জন্য হাত পাতেন। ঐ প্রতিবেশী যখন জাহানারা বেগমের ছেলেকে ঘটনাটা জানিয়ে দেন তখন পুরো ব্যাপারটা বেরিয়ে আসে। ছেলে এ নিয়ে হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করে অভিযোগ করেন যে, প্রতারকদের একটি চক্র তার মাকে বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
ভুয়া ফেসবুক আইডি
চলতি সপ্তাহে ভুয়া ফেসবুক আইডি দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে মনোয়ার হোসেন নামে এক জনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি। তিনি ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পর তাদের প্রলুব্ধ করে পুরুষ ক্লায়েন্টদের চাহিদা মতো সরবরাহ করত। সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মাহমুদুল ইসলাম জানান, বিষয়টি সিআইডি মনিটরিং সেল দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছিল। নিজস্ব প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মনিটরিং সেল তাকে চিহ্নিত করে আটক করে। সিআইডির এ কর্মকর্তা আরো বলেন, মনোয়ার হোসেনের গ্রামের বাড়ি যশোর জেলায়। তিনি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন।
মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস
এজেন্ট ও গ্রাহকের সমন্বয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এ চক্র। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সহজেই অপরাধীরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কয়েক মাস আগে এ চক্রের দুই সদস্যকে ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, মিতু আক্তারের (ছদ্মনাম) মোবাইল ফোনে একদিন বলা হয়, আপনার সন্তান অপহূত হয়েছে। যদি সন্তান ফেরত চান ইমোতে নগ্ন হয়ে ভিডিও কল দিতে হবে। সন্তানের কথা ভেবে তিনি তা করেন। যদিও কিছু সময় পর তিনি জানতে পারেন অপহরণের বিষয়টা মিথ্যা। পরবর্তীকালে চক্রটি ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে টাকা দাবি করত।
অনলাইনে যৌন নিপীড়ন
সিআইডি সম্প্রতি শাহ জাহাঙ্গীর আলী নামে এক জনকে মৌলভীবাজার থেকে গ্রেফতার করে। তিনি নিজেকে প্রবাসী পরিচয় দিয়ে নারীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করত। পরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে খোলামেলা ছবি সংগ্রহ করত। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দাবি করত। যারা রাজি হতো না, তাদের নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি তৈরি করে ভিকটিমদের নগ্ন ছবি প্রকাশ করে।
রাইড শেয়ারিং প্রতারক চক্র
সিআইডি পুলিশ একই দিন রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে রাইড শেয়ারিং প্রতারক চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করে। প্রতারকরা চালকদের কাছ থেকে মিথ্যা কথা বলে গাড়ির কাগজ, আইডি কার্ডের কপিসহ অন্যান্য কাগজপত্র সংগ্রহ করে। নকল অ্যাপস বানিয়ে সেখানে চালকদের ঢোকাত। এরপর আর্থিক লেনদেনের জন্য ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে বিকাশ একাউন্ট খুলে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নিত।
