ড. অরূপরতন চৌধুরী
মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রত্যেক শব্দসৈনিক অস্ত্র হাতে না নিলেও তাদের কণ্ঠ, কলমের লেখনি, বুদ্ধিমত্তা আর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড দিয়ে সেই সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন ও দেশবাসীর মনোবলকে অটুট রেখেছেন, সাহস দিয়েছেন, উত্সাহ যুগিয়েছেন, সর্বোপরি বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তাই জাতির জনকের কন্যা মাদার অব হিউম্যানিটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব শব্দসৈনিককে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিয়েছেন, তেমনি ভাতাও দিয়েছেন। এ কাজটি অতীতের কোনো সরকার করতে পারেনি। এ জন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সব শব্দসৈনিকের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম, যুদ্ধে যাবো, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান করব। ১৯৭১ সালের জুন মাস, মুক্তিযুদ্ধ চলছে। জুন মাসে কোনো এক ভোররাত। ঘুম থেকে উঠলাম। খাটে মশারি টানানো। পরনের কাপড়েই বেরিয়ে গেলাম, ঘরের কাউকে কিছু না বলে। ঘরে মা-বাবা, ভাই-বোন। আমি পরিবারের সবার ছোটো ছেলে, খুব আদরের। মাকে বলতে গেলে হয়তো পরিবেশ আরো দুঃখ ভারাক্রান্ত হবে। আবেগ ধরে রাখতে পারব না। মাকে ছেড়ে যেতে পারব না। কান্নাকাটি শুরু হয়ে যাবে। তাই ভোর ৫টায় চুপি চুপি দরজাটা খুলে ঘর থেকে পালালাম। কোনো দলের সঙ্গে বা কারো সঙ্গে নয়, একা বেরিয়ে গেলাম যুদ্ধ করতে, গন্তব্যস্থল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। নীলক্ষেত থেকে ইপিআরটিসি বাসে উঠলাম। কাঁচপুর, দাউদকান্দি হয়ে কুমিল্লা পৌঁছালাম। দাউদকান্দিতে গিয়ে দেখলাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ব্রাশ ফায়ার করছে সবাইকে চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কাউকে আবার ছেড়ে দিচ্ছে, আমাকে কোনো প্রশ্ন না করে এক ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল মিলিশিয়া আর রাজাকার আল-বদররা। দৈবক্রমে বেঁচে গেলাম। ঈশ্বর বুঝি আমার সহায়। এরপর কুমিল্লার আড়িখোলা গ্রামের এক পরিবারের সহযোগিতায় পার হলাম বর্ডার। পৌঁছলাম আগরতলা। সেখানে কলেজটিলায় গণসংগীতের একটি দল ইতিমধ্যে অনুষ্ঠান শুরু করেছে। সেখানে এক মাস থাকলাম। কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য দেশত্মবোধক, উদ্দীপনামূলক গান শোনানো। এরপর পল্লিগীতি শিল্পী মরহুম সরদার আলাউদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে আগরতলা থেকে কলকাতায় ৫৭/২, বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান শুরু করলাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত এবং সেখানে রেকর্ডকৃত বেশির ভাগ গানেই আমার কণ্ঠ আছে।
১৯৭০ সালে আমি ঢাকা ডেন্টাল কলেজে ভর্তি হই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের চারতলায় ঢাকা ডেন্টাল কলেজ ছিল। ডাকসুর সমস্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে সে সময় আমি জড়িত ছিলাম। তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এবং ডেন্টাল কলেজ একই ছাত্র সংগঠনের আওতাধীন ছিল। বছরের সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতাম। ’৭১ থেকে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। সেই সময় ঢাকায় বিক্ষুব্ধ শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হই। তখন আমরা রাস্তায় রাস্তায় গান করি। সমস্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে তখন আমি জড়িত ছিলাম। জুন মাসের প্রথম দিকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গেলাম। আগরতলা থেকে সরদার আলাউদ্দিনের (বিশিষ্ট লোকসংগীতশিল্পী) সঙ্গে ট্রেনে চড়লাম কলকাতার উদ্দেশে। ট্রেনে ছিলাম চার দিন চার রাত। ট্রেনে টিকিট লাগত না সেই সময়। বলা হতো, জয় বাংলা এসেছে। এরপর কলকাতায় পৌঁছালাম। সেখান থেকে মরহুম আবদুল মান্নান (পরবর্তীকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী) পাঠালেন ৫৭/২ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। সেটিই ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অফিস। এই সময়—পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, নোঙর তোলো তোলো, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি ইত্যাদি দেশের গান গাওয়া হতো দল বেঁধে। যতগুলো রেকর্ড করা গান রয়েছে সবগুলোতেই আমার কণ্ঠ রয়েছে। কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে আমরা গান গাইতাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হলো, স্বাধীন বাংলা বেতারে একদিন প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী হরলাল রায় আমাকে দিয়ে একটি দ্বৈত সংগীত গাওয়ালেন নাসরিন আহম্মদ শীলু আপার সঙ্গে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি, তখন তিনি ইংরেজি সংবাদ পাঠ করতেন) গানটির কথা ছিল—‘জ্বলছে জ্বলছে, প্রাণ আমার দেশ আমার’। গানটি লিখেছিলেন শহিদুল ইসলাম। এই গানটি ছিল আমার গাওয়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রথম দ্বৈত সংগীত। গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারের দিন প্রথমবারের মতো আমার নাম ঘোষণা করা হয়। দিনটি ছিল ২১ অক্টোবর ১৯৭১, দ্বিতীয় অধিবেশনে গানটি প্রচার হয় এবং সেই দিনই আমার বাবা-মা বাংলাদেশে থেকে জানতে পারেন আমি জীবিত আছি, এটা আমার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
প্রথম পর্যায়ে চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র সংগঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম বেতারের ১০ জন নিবেদিত কর্মী (দুই জন বেতার কর্মী ছিলেন না), স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জনগণ এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহযোগিতায়।
দুই দিন পর এই বেতার কেন্দ্রের নাম থেকে বিপ্লবী কথাটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচার বাধাহীনভাবে এগোতে পারেনি। প্রচণ্ড বাধা এলো চার দিনের মধ্যে। শত্রুর বোমারু বিমান থেকে ৩০ মার্চ, ৭১ চট্টগ্রাম বেতারের কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে বোমা ফেলা হলো। উপায়ান্তর না দেখে বাংলার বীর শব্দসৈনিকরা তত্কালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সহায়তায় একটি ক্ষুদ্র ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার বয়ে নিয়ে যান মুক্তাঞ্চলে। ১৭ এপ্রিল, কুষ্টিয়ার বৈদ্যনাথতলায় এই অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশের পর মুক্তিযুদ্ধের প্রচার জোরদার করার উদ্দেশ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রকে নতুন করে সংগঠনের দায়িত্ব অর্পিত হয় আবদুুল মান্নান, এমএন-এর ওপর। মুজিবনগরে ৫০ কিলোওয়াট (মধ্যম তরঙ্গ) শক্তিসম্পন্ন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শুভ সূচনা হয় ২৫ মে। পূর্ণ উত্সাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে শুরু হয় এই বেতার কেন্দ্রের প্রচার। দৈনিক সকাল ৭টা ও সন্ধ্যা ৭টা—এ দুই অধিবেশনে শুরু হয় এ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান সূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলা এবং ইংরেজি খবর, সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান ‘অগ্নিশিখা’, ‘চরমপত্র’ ‘বিশেষ কথিকা’, ‘বঙ্গবন্ধুর বাণী’ এবং দেশাত্মবোধক গানের অনুষ্ঠান ‘জাগরণী’। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কাজ চলত ছোটো একটি দ্বিতল বাড়িতে। অনুষ্ঠান বাণীবদ্ধ করার জন্য স্টুডিও ছিল মাত্র একটি। পরে আর একটি কক্ষ খালি করে অনুষ্ঠান রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা হয়। তবে এগুলোয় পেশাগত স্টুডিওর মতো কোনো শব্দ-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না প্রয়োজনীয় বাদ্যযন্ত্র। অবশ্য পরবর্তীকালে বাদ্যযন্ত্রের আংশিক অভাব পূরণ হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিচতলায় ছিল রান্নাঘর, ওখানেই আমরা খেতাম।
এই কেন্দ্র থেকেই বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের ভাষণ ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল প্রথমবারের মতো বহির্বিশ্বে প্রচারিত হয়। মুজিবনগর সরকার নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ বেতার কেন্দ্রের গুরুত্ব অনুধাবন করে ভারত সরকারের সহযোগিতায় স্বাধীন বাংলা বেতর কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করে। প্রাপ্ত যন্ত্রপাতি দিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ১৯৭১ সালের ২৫ মে মুজিবনগর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করে, যা ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
n লেখক :একুশে পদকপ্রাপ্ত, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ডেন্টাল সার্জারি, বারডেম হাসপাতাল
ইব্রাহীম মেডিক্যাল কলেজ
