লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়ে বিজয় এসেছিল বাংলায়

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১৭

 ‘পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে/ জ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে, নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক/ এই বাংলায়/ তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।’ কবি শামসুর রাহমানের এই কবিতা একাত্তর সালের            এই দিনে সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছিল বাঙালি জাতির জীবনে। ৪৮ বছর আগে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে এই ১৬ই ডিসেম্বরে এসেছিল বাংলার স্বাধীনতা। ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই দেশে উদিত হয়েছিল নতুন এক সূর্য। সে সূর্য কিরণে লেগে ছিল রক্ত দিয়ে অর্জিত বিজয়ের রং। সেই রক্তের রং সবুজ বাংলায় মিশে তৈরি করেছিল বাংলার লাল-সবুজ পতাকা। যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের ৭ই মার্চ ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে জাতিকে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই পরাজয় মেনে নিয়ে মাথা নত করে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য অস্ত্র সমর্পণ করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।

আজ কৃতজ্ঞ জাতি সশ্রদ্ধ বেদনায় স্মরণ করবে দেশের বীর সন্তানদের। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জনতার ঢল নামবে। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সব প্রান্তের মানুষ অংশ নেবে বিজয় দিবসে। বিজয়ের ৪৮ বছর পেরিয়ে এবার ৪৯তম বিজয় দিবস। এবারের বিজয় দিবস এসেছে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে। আগামী ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং এর পরের বছর ২০২১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে বাংলাদেশ। মহান বিজয় দিবসে উপলক্ষ্যে পৃথক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১। বেলা ১টা নাগাদ কলকাতা থেকে ঢাকা এসে পৌঁছান যৌথবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরার চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব, মুক্তিযোদ্ধাদের উপ-অধিনায়ক এ কে খন্দকার প্রমুখ। বেলা ১টার পর জেনারেল হেড কোয়ার্টারে বসে আত্মসমর্পণের দলিল তৈরির বৈঠক। এক পক্ষে নিয়াজি, ফরমান আলী ও জামশেদ; অপর পক্ষে জ্যাকব, নাগরা ও কাদের সিদ্দিকী। সিদ্ধান্ত হয় দলিলে স্বাক্ষর করবেন বিজয়ী বাহিনীর পক্ষে পূর্বাঞ্চলীয় ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর জয়েন্ট কমান্ডিং ইন চিফ লে. জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা এবং বিজিত বাহিনীর পক্ষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কামান্ডার লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজি।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই জেনারেল অরোরা আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য বিমান ও নৌবাহিনীর চিফ অব স্টাফসহ কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছান। নিয়াজি অভিবাদনসহ অভ্যর্থনা জানান যৌথ বাহিনীর কমান্ডারকে। বিকাল পৌনে ৫টায় লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এলেন। সামরিক বিধি অনুসারে বিজয়ী ও বিজিত সৈনিকরা শেষ বারের মতো জেনারেল নিয়াজিকে গার্ড অব অনার জানায়।

বিকাল ৫টায় জেনারেল নিয়াজি ও যৌথ বাহিনীর অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা এগিয়ে গেলেন ময়দানে রাখা একটি টেবিলের দিকে। জেনারেল অরোরা বসলেন টেবিলের ডান দিকের চেয়ারে, বাম পাশে বসলেন জেনারেল নিয়াজি। দলিল আগে থেকেই তৈরি করা ছিল। জেনারেল অরোরা স্বাক্ষর করার জন্য দলিল এগিয়ে দেন নিয়াজির দিকে। তখন বিকাল ৫টা ১ মিনিট। নিয়াজি দলিলে স্বাক্ষর করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে। দীর্ঘ ৯ মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে এলো নতুন প্রভাত।

ঢাকায় ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরের জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমভিত্তিক বহর প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্রপতি এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। বিজয় দিবস সরকারি ছুটির দিন।

এছাড়া দিবসটি উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগের দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী সংগঠনের কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন এবং বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন। এছাড়া সকাল ১০টায় টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, জিয়ারত, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন ১৭ ডিসেম্বর বেলা ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতীয় পার্টি-জেপির শুভেচ্ছা

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন। আজ সকাল সাড়ে ৬টায় জেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সব দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৮টায় সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং মুক্তিযুদ্ধে বীর শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। ১৯ ডিসেম্বর বেলা ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ‘জহুর হোসেন চৌধুরী’ হলে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেবেন জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখবেন বরেণ্য রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধাগণ।