১০৭৮৯ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১৮

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালের দালাল আইনে মামলা হয়েছিল তাদেরকে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করে প্রথম দফায় ১০ হাজার ৭৮৯ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।      জানা গেছে, ১৯৭০ সালের উপনির্বাচনে যেসব ব্যক্তিকে এম পি এ বা এম এন এ নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছিল তারাও রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত হবেন।

গতকাল রবিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক তার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তালিকা প্রকাশ করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে এ তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এটি পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হতে থাকবে। জেলা প্রশাসনগুলো যথাসময়ে তথ্য না দেওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, তাদেরকে আবারও তাগিদ দেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে দালাল আইনে প্রায় ৫৫ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু বেশকিছু ব্যক্তিকে (যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণ, খুন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ গুরুতর অভিযোগ ছিল না) সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি দিয়েছিলেন। এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল শুধু তাদের নাম এই তালিকায় রয়েছে। এটি মন্ত্রিসভায় কিংবা সংসদে অনুমোদিত নয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে কোনো সরকারি আদেশ বা গেজেট দ্বারা এই তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা তিনি ঘোষণা করছেন সরকারের অংশ হিসেবে। প্রথম তালিকা গতকালই মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে (www.molwa.gov.bd) দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো তালিকা প্রকাশ করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দীর্ঘ ৯ মাস তাদের স্থানীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে। তিনি বলেন, একটা বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা নিজেরা তৈরি করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যেসব পুরোনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল শুধু সেটুকু প্রকাশ করছি। তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে কি-না জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, কোনো গেজেট প্রকাশ করা হবে না। তবে জাতি প্রত্যাশা করলে এবং সরকার মনে করলে গেজেট করবে। আমরা তালিকা প্রকাশ করলাম, আগে প্রতিক্রিয়া দেখব, জাতি চাইলে এটা হবে।

প্রসঙ্গত, প্রায় এক দশক আগে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর রাজাকারের তালিকা তৈরির দাবি জোরালো হয়। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, রাজাকারের কোনো তালিকা সরকারের কাছে নেই। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বরাবরই রাজাকারের তালিকা প্রকাশের দাবি করে আসছে।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালে খুলনায় আনসার হেডকোয়ার্টার্সে পাওয়া তালিকায় ৩০ হাজারের বেশি রাজাকারের তথ্য মিলেছিল। ঐ তালিকাটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রয়েছে। গত ২৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহের কাজ শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়।

সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন থানা থেকে ১৯৭১ সালের বেতনভোগী রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহের জন্য চলতি বছরের ২১ মে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। পরে ঐ তালিকা করার জন্য আবারও তাগিদ দেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি শাজাহান খান সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, তালিকা হাতে আসা শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ১৬ ডিসেম্বর থেকে যতটুকু আসবে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় বিজয় দিবসের আগের দিন গতকাল স্বাধীনতার ৪৮ বছরের মাথায় ৬৫৯ পৃষ্ঠার প্রথম তালিকা প্রকাশ করল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অনেক নথি সুকৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধীরা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা ও নথিসমূহ বিনষ্ট করা হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণ তালিকা পাওয়া কঠিন হচ্ছে। তিনি বলেন, তত্কালীন ১৯ জেলার রেকর্ডরুমে যেসব দালিলিক প্রমাণ ছিল, সেগুলো দিতে বলা হয়েছিল; তবে আশানুরূপ তালিকা পাইনি। তাই জানুয়ারি মাসের মধ্যে রেকর্ড পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে। বিভিন্ন জেলার রেকর্ডরুম এবং ঐ সময়ে বিজি প্রেসে ছাপানো তালিকাও সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, যাচাই-বাছাই করে ধাপে ধাপে আরো তালিকা প্রকাশ করা হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে মোজাম্মেল হক বলেন, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যদি কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে এই তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের বিচারের দ্বার উন্মোচিত হবে। তবে কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই তালিকা নয়। তালিকাভুক্ত হলে মামলা করা যাবে বা তালিকাভুক্ত না হলে মামলা করা যাবে না এমন নয়। বাদী অভিযোগ আনলে মামলা হবে। মন্ত্রী আরো বলেন, প্রথম ধাপের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করা হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বেচ্ছায় যারা ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন তারাও স্বাধীনতাবিরোধী। সাবেক একজন রাষ্ট্রপতির নাম উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তিনি শান্তি কমিটির প্রধান ছিলেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা ২৬ মার্চ

তালিকা যাচাই-বাছাই করে আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ‘কোনো না কোনো তালিকায় ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৫৬ জন মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। এর মধ্যে দাবিদার মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৫১ হাজার ২৮৫ জন। বর্তমানে ভাতাভোগী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ১ হাজার ৪৬১ জন। কিন্তু এই ২ লাখ ৫১ হাজার ২৮৫ সংখ্যক তালিকার অনেক মুক্তিযোদ্ধার নামে একাধিক গেজেট বা অন্যান্য দলিল থাকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেশি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় তালিকা, লাল মুক্তিবার্তা ও গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ১০ হাজারের বেশি হবে না।’ একাধিক দলিলভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাগণের চূড়ান্ত একক তালিকা তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন বলে জানান মন্ত্রী।