রাতভর অস্ত্র পাহারা দিতেন শহিদ জুয়েলের বাবা-মা

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:১৩

প্রতি বছর এই দিনটায় (১৬ ডিসেম্বর) মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এসে হাজির হন সুরাইয়া খানম। গতকালও ব্যতিক্রম হয়নি। বিজয় দিবসের সকালেই শেরেবাংলায় হাজির তিনি। এবার তার সঙ্গে ছিলেন ছোটো বোন সালমা চৌধুরীও। দুজনই মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ক্রিকেটার আব্দুল হালিম চৌধুরী জুয়েলের বোন। সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসানের স্ত্রীসহ তারা বসেছিলেন ড্রেসিংরুমে।

মাঠে তখন বিজয় দিবসের প্রদর্শনী টি-২০ ম্যাচে ব্যস্ত সাবেক ক্রিকেটাররা। শহিদ জুয়েল ও শহিদ সংগঠক মুস্তাকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে প্রতি বছরই এমন ম্যাচ খেলে থাকেন আকরাম-নান্নু-দুর্জয়রা।

ড্রেসিংরুমে বসে ছোটো ভাই শহিদ জুয়েল সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসজল হয়ে পড়ে সুরাইয়া খানমের চোখ। কথা আটকে আসে গলায়। ধরে আসা কণ্ঠে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের আগস্টে মগবাজার থেকে হানাদার বাহিনী আটক করে জুয়েলসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রমনা থানায় দিনের বেলায় আনা হতো তাদের। ২ সেপ্টেম্বর থেকে আর জুয়েলের সন্ধান পায়নি তার পরিবার। স্বাধীনতার পর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মেলেনি লাশ।

ক্রিকেট, চাকরি ছেড়ে শহিদ জুয়েলের মুক্তিযুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে গতকাল সুরাইয়া খানম জানান, ‘২৫ মার্চ কালোরাত্রির সময় মুস্তাককে যখন মেরে ফেলা হয়। এরপরই সে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে যুদ্ধে নামবে। ভারত যাবে। আমাদের পাড়ায় জুয়েলের যে বন্ধুবান্ধব ছিল, ওরা সবাই আমাদের বাসায় এসে আলোচনা করত। আমরা বুঝতাম যে মিটিং করছে বা কবে যাবে। এর মধ্যে দুই-একবার যাওয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু যেতে পারেনি। শেষের দিকে গেছে। মে মাসের দিকে।’

এক-দুই মাস পরই ট্রেনিং শেষে ফিরেছিলেন শহিদ জুয়েল। তখন তার বেশভূষা, চেহারা দেখে ঠিকমতো চিনতেও পারছিল না তার পরিবার। নিজেদের অপারেশন সম্পর্কে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করতেন মুক্তিযোদ্ধারা।

ফার্মগেটের খামারবাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনে ছিলেন শহিদ জুয়েল। রাতভর ছেলের আনা অস্ত্র পাহারা দিয়েছেন তার বাবা-মা। সুরাইয়া খানম বলেন, ‘ফার্মগেটে যে অপারেশনটা হয় সেটায় জুয়েল ছিল। সেই অপারেশনে ১৮ জনের মতো (পাকিস্তানি আর্মি) মারা যায়। ও যে খাটে ঘুমাতো সেখানে দেখি একটু উঁচু উঁচু। কোণা উঠিয়ে দেখি অস্ত্র। আরেকবার সে অনেকগুলো অস্ত্র নিয়ে আসে। আমাদের বাসায় অনেকগুলো ঘর ছিল, মাঝে যে ঘরটা ছিল সেখানে আমার বাবা-মা সারারাত পাহারা দিয়েছে (অস্ত্রগুলোকে)।’

রাজাকারদের তথ্য পেয়ে মগবাজার থেকে জুয়েলদের আটক করে পাক হানাদার বাহিনী। সুরাইয়া খানম বলেন, ‘আলমদের বাসা ছিল ইস্কাটনে। ওখান থেকে বের হয়েছে এটা বলে যে, অনেক দিন আম্মার সঙ্গে দেখা হয় না, একটু দেখা করে আসি। এটা বলে সে আবার আজাদদের বাসায় গেছে (মগবাজার)। ওখানে আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধারা ছিল। ঐখানে গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে যায়, তখন আজাদের মা ওদের ওখানে থেকে যেতে বলে। তখন রাজাকাররা খবর পেয়ে রেট দিয়ে ওদের ধরে নিয়ে যায়।’

আটক হওয়ার পর রমনা থানায় দুই দিন ছেলের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শহিদ জুয়েলের বাবার। সুরাইয়া খানম বলেন, ‘জুয়েলকে রমনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাতে রাখা হতো, সকাল ১০টার দিকে এসে নিয়ে যাওয়া হতো। এম্পি হোস্টেলে নিয়ে গিয়ে ওদের নির্যাতন করা হতো কথা বের করার জন্য। এক দিন ভোরের দিকে ক্যাপ্টেন রোকসানার (প্লেন চালাতেন যিনি) বাবা রমনা থানায় গিয়ে ওকে দেখতে পায়। তখন সে বলে আমার বাবাকে একটু খবর দিয়েন। আমাকে ধরে নিয়ে আসছে। সেখান থেকে এসেই উনি আমার বাবাকে খবর দেন যে ওকে ধরে নিয়ে গেছে।’

এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের ক্রিকেট। মিরপুর স্টেডিয়ামে দুটি গ্যালারি নামকরণ করা হয়েছে শহিদ জুয়েল-মুস্তাকের নামে। সুরাইয়া খানমের চাওয়া, শেরেবাংলায় স্থাপন করা হোক দুই কীর্তিমানের মুর্যাল। যেখানে খোদাই করা থাকবে তাদের পরিচিতি। তাতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে তাদের বীরত্ব, সাহসিকতার ইতিহাস।