প্রতিপক্ষকে ফাঁসাইতে বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জালিয়াতি করিয়া ভুয়া ওয়ারেন্ট তৈরি করিতেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই বিষয়ে সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হইয়াছে। পত্রিকান্তরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র উল্লেখপূর্বক জানা গিয়াছে যে, সম্প্রতি ভুয়া ওয়ারেন্ট জারির বিপুলসংখ্যক অভিযোগ পাওয়া গেলেও এই ব্যাপারে এখনো গুরুত্বপূর্ণ কোনো ক্লু পাওয়া যায় নাই। অথচ আইনসংশ্লিষ্টরা স্পষ্ট করিয়াই বলিতেছেন যে, খুব সহজে ভুয়া ওয়ারেন্ট তৈরি করিয়া থানায় পাঠাইবার কোনো সুযোগ নাই। কারণ বিচারাধীন মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের আদেশ বিচারক দেওয়ার পর ওয়ারেন্ট তৈরি হয়। ইহার পর বিচারকের সিল-স্বাক্ষরসহ ডেসপাস শাখায় জমা দেওয়া হয়। ইহা ছাড়া কখনো কখনো আদালত হইতে সরাসরি থানাপুলিশের নিকট গ্রেফতারি ওয়ারেন্ট পাঠানো হয়। অর্থাত্ এই যথাবিহিত নিয়ম-পদ্ধতি অনুসারে ভুয়া ওয়ারেন্ট তৈরি করা দুঃসাধ্য বটে! এখন প্রশ্ন হইল, এই দুঃসাধ্য অপকর্মই কী করিয়া সংঘবদ্ধ চক্রের নিকট ডালভাত হইয়া যাইতেছে? আশঙ্কা করা হইতেছে, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রটি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নিরপরাধ লোকদের ব্ল্যাকমেইল করিতেছে। ভুয়া ওয়ারেন্টে গ্রেফতারের ভয়ে নিজ বাসস্থান ছাড়িয়া পালাইয়া বেড়াইবার ঘটনাও জানা গিয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে এই সকল সাধারণ মানুষ জীবনে হয়তো একটি কলাগাছও কাটেন নাই, তবুও ভুয়া ওয়ারেন্টে আলোচিত হত্যা মামলার আসামি করা হইতেছে, যাহার ফলে তাহার স্বাভাবিক ছন্দের জীবনে ঘটিতেছে ভয়াবহ ছন্দপতন।
প্রতিটি ভুয়া ওয়ারেন্টেই বিচারকের নাম, ওয়ারেন্টের নম্বর, সিলমোহর, ডেসপাস নম্বর—সকল কিছুই থাকিতেছে। আর এই ওয়ারেন্ট যখন থানায় যায় তখন তাহাদের বোঝার উপায় থাকে না যে, উহা আসল নাকি ভুয়া। এই কারণে কোনো কোনো আইনজীবী মনে করেন, আদালতের কোনো অসাধু কর্মচারী জড়িত না থাকিলে এত নিখুঁতভাবে ভুয়া ওয়ারেন্ট তৈরি করা সম্ভব নহে। এমনকি আইনজীবী সহকারীদেরও কেহ কেহ ইহার সহিত যুক্ত থাকিলেও তাহাতে বিস্ময়ের কিছু থাকিবে না। জানা গিয়াছে, ভুয়া ওয়ারেন্টের এই চক্র শুধু ঢাকায় নহে, সারাদেশের আদালতেই সক্রিয়। এমনকি হয়রানি করিতে এক জেলার মানুষের বিরুদ্ধে আরেক জেলার আদালতের নামে ভুয়া ওয়ারেন্ট প্রেরণ করা হয়। এই ভুয়া ওয়ারেন্টের ফাঁদে পড়িয়া অনেককেই কারাগারে বন্দিজীবন কাটাইতে হইতেছে।
আইনজীবীরা মনে করিতেছেন, এইরকম ভুয়া ওয়ারেন্ট আদালতের জন্য একটি সংকট হইয়া দাঁড়াইয়াছে। যদিও এই ধরনের চক্রের কয়েক জন সদস্য ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হইয়াছে। বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তর যথাযথ গুরুত্বের সহিত তদন্ত শুরু করিয়াছে বটে। তবে অনেকেই মনে করেন, ভুয়া ওয়ারেন্ট হইতে রেহাই পাইতে ওয়ারেন্ট যাচাইয়ের বিধান চালু করা যাইতে পারে। কোনো আদালত হইতে কোনো থানায় ওয়ারেন্ট আসিলে তাহা যদি যাচাই-বাছাই করিয়া তামিলের বিধান করা হয়, তাহা হইলে ভুয়া ওয়ারেন্ট ধরা পড়িবে তামিলের পূর্বেই। আমরা আশা করিব, এই সমস্যার কার্যকর সমাধান বাহির করিতে কালক্ষেপণ করিবে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
