কাউন্সিলকে ঘিরে জাপায় আবারও সংকটের আভাস

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:৪৩

কাউন্সিলকে ঘিরে নেতৃত্বের প্রশ্নে আবারও নতুন করে সংকট দেখা দিতে পারে জাতীয় পার্টিতে (জাপা)। আগামী ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলে নিজের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ সংহত করতে চান জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তবে তার এই চাওয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ এবং তার অনুসারী কয়েক জ্যেষ্ঠ নেতা। ফলে সোয়া তিন মাস আগে, অর্থাত্ গত ৭ সেপ্টেম্বর দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সমঝোতা টিকে থাকা নিয়ে সংশয়ে জাপার নেতাকর্মীরা।

দলের আসন্ন কাউন্সিলকে সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ বিবাদের বিষয়টিকে ইঙ্গিত করে জি এম কাদেরও বলেছেন, ‘ভয়ের কিছু নেই, আমি ভয় পাই না। আমার শক্তির উত্স নেতাকর্মীরা। তারা যাকে নেতা নির্বাচন করবেন, তাকে মেনে চলতে হবে। কিন্তু নেতা থাকবেন এক জন।’

জুলাইয়ে এরশাদের মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই দলের নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের প্রশ্নে কলহ দেখা দেয় রওশন ও জি এম কাদেরের মধ্যে। দলে ভাঙনের উপক্রম হলে ৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ক্লাবে সমঝোতা বৈঠক করেন উভয় পক্ষের ১০ নেতা। সেই রাতের সমঝোতা অনুযায়ী রওশন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হন, আর কাদের হন দলের চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা।

রওশনপন্থি হিসেবে পরিচিত জাপার দুই জন প্রেসিডিয়াম সদস্য ইত্তেফাককে জানান, ৭ সেপ্টেম্বরের লিখিত সমঝোতায় বলা হয়েছে, ‘কাউন্সিল পর্যন্ত জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন কাউন্সিলে।’ এই দুই নেতার মতে, ২৮ ডিসেম্বর কাউন্সিলে দলের কাউন্সিলররাই নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত করবেন। সে ক্ষেত্রে জি এম কাদেরসহ যে কেউ চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।              জাপার একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার জন্য এবং রংপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনে ছেলে শাদ এরশাদকে দলীয় মনোনয়ন দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার স্বার্থেই তখন দেবর জি এম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে মেনে নেন রওশন। তবে কাউন্সিলে কাদের চেয়ারম্যান হলে সে ক্ষেত্রে দলে নিজের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে ভাবছেন রওশন। কাদেরকে চেয়ারম্যান মেনে নিয়ে তিনি আবারও সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান পদেই থাকবেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারছেন না কাদেরপন্থিরা। ৫ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণাকারী জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং তখন রওশনের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণকারী প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম ছাড়াও দলের সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের নীরবতাও কাদেরপন্থিদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। অবশ্য দলের কাউন্সিল উপলক্ষ্যে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে আহ্বায়ক ও মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে সদস্যসচিব করে ১০১ সদস্যের যে প্রস্তুতি কমিটি করা হয়েছে সেখানে রওশন, রুহুল আমিন হাওলাদার ও ব্যারিস্টার আনিসকে রাখা হয়েছে সদস্য হিসেবে। এসব বিষয়ে রওশন সম্প্রতি সংসদ ভবনে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের দলের তো কোনো খবর নেই। দেখা যাক কী হয়।’

তবে রওশনপন্থি একাধিক নেতা ইত্তেফাককে জানান, কাউন্সিলে জি এম কাদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে সে ক্ষেত্রে দলে রওশনের অবস্থান কী হয়, নতুন কমিটিতে দলের সিনিয়র নেতাদের কার কী অবস্থান হয়, সেটি দেখার পরেও প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে রওশন ও তার পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারী নেতাদের কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়—সেদিকে চোখ রাখছেন এই অংশের নেতারা।

এদিকে এরশাদের মৃত্যুর পর রওশনের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণকারী নেতাদের কাউকে কাউকে নিজের পক্ষে টানতে তাদেরকে ইতিমধ্যে ‘খুশি’ করেছেন জি এম কাদের। নারায়ণগঞ্জের দলীয় দুই সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ও লিয়াকত হোসেন খোকাকে গত বুধবার পদোন্নতি দিয়ে প্রেসিডিয়াম সদস্য করেছেন জাপা চেয়ারম্যান। রওশনের পক্ষে থাকা দলের দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম ও এসএম ফয়সল চিশতিকেও কৌশলে কাছে টানতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এছাড়া উপনির্বাচনে শাদের পক্ষে কাজ করা ছাড়াও পরে তাকে দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব বানিয়েছেন জি এম কাদের। কাদেরের কৌশলের কাছে দৃশ্যত রওশন পিছিয়ে পড়লেও পর্দার আড়ালে খেলা থেমে নেই বলে মনে করছেন জাপার বেশির ভাগ নেতাকর্মী।

জি এম কাদেরের পক্ষে থাকা জাপার একাধিক প্রেসিডিয়াম সদস্য জানান, নেতৃত্বের প্রশ্নে দলের ভেতরে এত দিন বিভিন্ন ইস্যুতে আপস করলেও কাউন্সিলের পর শক্ত হাতে দল চালাতে চান জি এম কাদের। সেই লক্ষ্যে দল পরিচালনায় ভাই এইচএম এরশাদের পথেই হাঁটবেন তিনি। জাপার গঠনতন্ত্রে বিতর্কিত ধারা বলে পরিচিত ২০-এর ‘ক’ ও ‘খ’ উপধারা এবারের কাউন্সিলেও সংশোধন হচ্ছে না। ইচ্ছামাফিক দল চালাতে এবং নিজের একচ্ছত্র ক্ষমতা বজায় রাখতে গঠনতন্ত্রে এই ধারাটি বহাল রাখার পক্ষে ইতিমধ্যে মত দিয়েছেন জি এম কাদের। উল্লেখ্য, ২০-এর ‘ক ও ‘খ’ উপধারায়  চেয়ারম্যানের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা আছে, ‘...চেয়ারম্যান জাপার যেকোন পদে যেকোন ব্যক্তিকে নিয়োগ, যেকোন পদ হইতে যেকোন ব্যক্তিকে অপসারণ ও যেকোন ব্যক্তিকে তাহার স্থলাভিষিক্ত করিতে পারিবেন।’

অন্যদিকে, কাউন্সিলের মাধ্যমে জাপার মহাসচিব পদে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। বর্তমান মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা ছাড়াও এই পদে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক দুই মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। এছাড়া মহাসচিব পদে কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা ও ফখরুল ইমামের নামও কমবেশি আলোচনায় আছে।