নব্বয়ের দশকে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ছিল মাদার টেক্সটাইল। তবে গ্যাস, বিদ্যুত্ সংকটে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল প্রতিষ্ঠানটি। বন্ধ হয়ে গেলেও ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়তে থাকে। অন্যদিকে বন্ধ কারখানার আড়াই হাজার শ্রমিকের বেতন-ভাতা পেছনেও যাচ্ছিল বিপুল পরিমাণ টাকা। এভাবে নানামুখী সংকটে এ টেক্সটাইল মিলটি রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছিল।
রুগ্ণ এ মিলটি এখন ঘুরে দাঁড়িয়ে মুনাফার মুখ দেখতে শুরু করেছে। আর রুগ্ণ এ শিল্পটিকে লাভের মুখ দেখাতে যে ব্যক্তি কাজ করেছেন তিনি হলেন এলিজা সুলতান। সঙ্গে আছেন ছেলে সোহেল আহমেদ সুলতান।
মাদার টেক্সটাইলের হাল ধরার ঘটনা বলতে গিয়ে এলিজা সুলতান বলেন, স্বামী আর শ্বশুর যখন অসুস্থ। ব্যাংক ঋণের চাপে যখন বন্ধ হয়ে গেছে এই বিশাল প্রতিষ্ঠানটি। এমন অবস্থায় মাদার টেক্সটাইলের হাল ধরতে হয়েছে। আগে এ ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা একজন নারীর পক্ষে বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ে দুই বছর বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানটিকে আবার দাঁড় করানো সহজ কাজ ছিল না।
এলিজা সুলতান বলেন, আমরা ব্যাংকের টাকা সময়মতো শোধ করতে পারিনি। ব্যাংকের ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচারের কোনো উদ্দেশ্যও আমাদের নেই। গ্যাস না পাওয়া, ব্যাংকের অসহযোগিতা আর বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আমরা ঋণ শোধ করতে পারিনি। তবে আমরা ঋণ শোধ করব। এজন্য প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছি।
তিনি জানান, আমরা ব্যাংকের বর্তমানে ঋণ পরিশোধে নিয়মিত হয়েছি। আমাদের পরিশোধ করার সুযোগ দিতে হবে। আমরা বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি ঘুরে দাঁড়ানোর। আমাদের পরিকল্পনাগুলো আমরা ব্যাংককে জানিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব। ব্যাংকের সব ঋণ শোধ করতে পারব।
নব্বইয়ের দশকে দেশের শীর্ষ ধনীদের একজন ছিলেন তার শ্বশুর মাদার টেক্সটাইলের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান আহমেদ। ১৯৯০ সালে সুলতান আহমেদ নিজেই একটি টেক্সটাইল মিল প্রতিষ্ঠা করেন, নাম দেন মাদার টেক্সটাইল। এলিজা বলেন, ১৯৯৩, ১৯৯৬, ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে চার দফায় নিজের বিনিয়োগ ২৪৬ কোটি টাকার সঙ্গে রূপালী ব্যাংক থেকে ১১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কারখানা সম্প্রসারণ করেন সুলতান আহমেদ। ব্যবসার বিপদ শুরু হয় কারখানায় গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায়।
এলিজা সুলতান বলেন, কারখানা বন্ধ থাকলেও ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়তে থাকে। নতুন যন্ত্রপাতি অকার্যকর হতে থাকে। একপর্যায়ে ব্যাংক ২০০১ সালে ঋণপত্র খোলা সীমিত করে দেয়, যা অব্যাহত ছিল ২০০৬ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঋণপত্র খোলা স্থগিত করে রাখা হয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে। ২০১০ সালের পর আরেকটি বড়ো ধাক্কা বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে। ঐ বছর থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তুলা ও সুতার দাম ছিল অস্থির।
এদিকে ব্যাংক ঋণ, কারখানা বন্ধ থাকা, আড়াই হাজার শ্রমিকের বেতন-ভাতা দিতে বিপুল অর্থের জোগান দেওয়া ইত্যাদি নানা দুশ্চিন্তায় ২০১০ সাল থেকে অসুস্থ সুলতান আহমেদ। গত বছর হঠাত্ অসুস্থ হয়ে বিছানাগত হয়ে পড়েন সুলতান আহমেদ। এরপর প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি বিদেশে একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ছিলেন। সুলতান আহমেদের একমাত্র ছেলে শোয়েব সুলতান ১২ বছর ধরে ফুসফুসের দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। ফলে তার পক্ষেও কখনো কোম্পানির দায়িত্বে যুক্ত হওয়া সম্ভব হয়নি।
অবশেষে দায়িত্ব নিয়ে কারখানা চালু করেন এলিজা সুলতান। কারখানার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমান। অল্প সময়ের মধ্যেই কারখানা আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ফলে কারখানার আড়াই হাজার শ্রমিক ফিরে পেয়েছে তাদের কর্মসংস্থান।
গাজীপুরে ৭৫ বিঘার ওপর প্রতিষ্ঠিত মাদার টেক্সটাইল। এ মিলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এলিজা বলেন, বর্তমানে মাদার টেক্সটাইলের ব্যাংকে ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭২৭ কোটি টাকা। এই ঋণের মধ্যে ব্যাংকের আসল টাকা ৪৪৬ কোটি টাকা। বাকি ২৬৩ কোটি টাকা অপরিশোধিত আরোপিত সুদ। এর বাইরে অনারোপিত সুদ রয়েছে ১৮৫ কোটি টাকা। এটা তিনি ব্যাংকের কাছে মওকুফ চেয়েছেন।
