বনফুলের বুধনী গল্পে হাজারীবাগের পার্বত্য প্রদেশের আদিবাসীদের বিয়ের বিচিত্র প্রথার কাহিনি পড়েছিলাম বহুদিন আগে। সকালে খোলা মাঠে সভা বসত। সেই সভায় কুমার এবং কুমারীদের সমাবেশ হতো। একটা পাত্রে খানিকটা সিঁদুর গোলা থাকত। কোনো এক অবিবাহিত যুবক কোনো কুমারীর পাণিপ্রার্থী হলে তাকে সেই কুমারীর কপালে ঐ সিঁদুর লাগিয়ে দিতে হতো। সিঁদুর লাগালেই কিন্তু পাণিপ্রার্থী যুবকের প্রাণ সংশয়। সেই কুমারীর আত্মীয়স্বজন তত্ক্ষণাত্ ধনুর্বান, সড়কি, বল্লম নিয়ে যুবককে তাড়া করবে এবং সেই যুবক যদি সারা দিন আত্মরক্ষা করতে না পারে—মৃত্যু সুনিশ্চিত। কিন্তু সে যদি সমস্ত দিন আত্মরক্ষা করতে পারে তাহলে সূর্যাস্তের পর আত্মীয়স্বজনেরা মহা আনন্দে মাদল বাঁশি বাজিয়ে হইহই করতে করতে কন্যাকে বরের ঘরে পৌঁছে দেবে।
২
একটা খুনের সংবাদে সুন্দর ঝকঝকে সকালটাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল। সকালের সূর্যতাপে কুসুম কুসুম হিমেল হাওয়াও গায়ে ফোসকা ফেলছে। মাছি ভাসছে চায়ের কাপে। খবরের কাগজটা গড়াগড়ি যাচ্ছে।
পুষ্পা আর সজীব। পাশাপাশি দুই গ্রামে বসবাস। একই স্কুল একই কলেজে পড়াশোনার কারণে বন্ধুত্ব হয়েছিল। বন্ধুত্ব থেকে মন দেয়ানেয়া। আজ রূপসা নদীর এপারে তো কাল রূপসা সেতুর ওপারে নদীর চরায়। বাদাম আর ডালমুটে মুচমুচে সময় বয়ে যায় নদীর ঘোলা জলে। কারো তেমন নজরে পড়ে না। উপচেপড়া লোকসংখ্যার দেশে খুব বেশি বেতাল না করলে কোনো ঘটনাই তেমন কেউ নজরে আনে না। ওদের ব্যাপারটাও সে রকম ছিল। বাতাসের সাগরে নাক উঁচিয়ে ভেসে থাকার মতো।
সজীব ভালো ছাত্র, বৃত্তি পেয়ে লেখাপড়া। ইউনিভার্সিটিতেও সুনাম। ভাঙা ঘরে চাঁদের আলোর মতো তার সুযোগ এলো বিদেশে পড়তে যাওয়ার। সবই চলছিল চন্দ্র সূর্য উঠবার স্বাভাবিক গতিতে। বিদেশ যাওয়ার আগে সজীব আর পুষ্পা নিজেরা বিয়ে করে ফেলে গোপনে। পুষ্পা রূপসা উপজেলার উঠতি ধনী ও প্রভাবশালী নেতার কন্যা। একই উপজেলার বাগমারা গ্রামের চাষির ছেলে সজীব। তেলে আর জলে তো মেলে না। খবর চাপা থাকেনি। নেতার মাথা চণ্ডাল হয়ে ওঠে।
আত্মগোপনেই ছিল সজীব। মাসখানেকের মধ্যে জানা গেল মাদক পাচারকারী হিসেবে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। কী আর করা। ক্রসফায়ার!
এক মাস পেরিয়ে গেলেও আত্মরক্ষায় পরাজিত সজীব।
বহুদিন আগে পড়া বনফুলের লেখা বুধনী গল্পটি মনে পড়ে গেল।
