রাজাকারদের তালিকা প্রসঙ্গ

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৪৭

গত রবিবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় হইতে রাজাকারদের যে তালিকা প্রকাশ করা হইয়াছে, তাহা লইয়া সারা দেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হইয়াছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুপরিচিত মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকায় দেখিয়া অনেকে হতাশা প্রকাশ করিয়াছেন। মুক্তিযোদ্ধার স্বজনরাও ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন, সামাজিক গণমাধ্যমেও তাহা ছড়াইয়া পড়িয়াছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী নিজেই খানিকটা বিব্রত হইয়াছেন এবং নিজেই পরিষ্কার জানাইয়াছেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের তৈরি করা তালিকাই প্রকাশ করা হইয়াছে মাত্র। যাচাই-বাছাই করিয়া ইহা ঠিক করা হইবে। সর্বশেষ তিনি তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করিয়া বলিয়াছেন, রাজাকারের তালিকায় ভুলভ্রান্তি বেশি হইয়া থাকিলে তাহা প্রত্যাখ্যান করা হইবে। উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উহা সংগ্রহ করিয়া দেয়।

নিঃসন্দেহে কাজটি চ্যালেঞ্জিং এবং জটিলও বটে। অনেক ক্ষেত্রে রাজাকার এবং তাহাদের সন্তানেরা প্রশাসনের লোকদের হস্তগত করিয়া ১৯৭১ সালের কাগজপত্র উধাও করিয়া ফেলিয়াছে। আবার কেহ কেহ যে ভোল পালটাইয়া ক্ষমতাসীন দলে প্রবেশ করিয়াছে, তাহা বিশিষ্ট সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাহার প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ করিয়াছেন।

বিষয়টি আরো গভীরে তলাইয়া দেখা দরকার। এই তালিকা যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অথবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেহ করেন নাই তাহা পরিষ্কার। ইহা আসিয়াছে ১৯টি তত্কালীন জেলার বর্তমান সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন হইতে। এবং তালিকাটি আসিয়াছে একটি প্রশাসনিক পদ্ধতির মধ্য দিয়া। সুতরাং এই ত্রুটিযুক্ত তালিকা প্রেরণে পরিষ্কারভাবে প্রশাসন তথা আমলাদের গাফিলতি পরিলক্ষিত হইয়াছে। মাঠ পর্যায় হইতে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত আমলাদের বহু স্তর রহিয়াছে। তাহারা কেহ এই তালিকার সত্যাসত্য, বাস্তবতা যাচাই করিয়া দেখিলেন না! বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, এমন মানুষ এখনো সকল এলাকাতেই রহিয়াছেন। জেলা প্রশাসন বিষয়টিতে গুরুত্ব দিলে সেই সকল প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে আলোচনা করিয়া, একটি সম্যক ধারণা লইয়া তাহার পর তালিকা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করিতে পারিতেন। কিন্তু কেহই যে তাহা করেন নাই। জেলা প্রশাসন হইতে ঐ তালিকা আসিয়াছে মন্ত্রীদের হাতে নহে, ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিকট। তাহারাও বোধ করি তালিকা খুলিয়াও দেখেন নাই! আমাদের মধ্যে যে কোনো ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করিবার একটি প্রবণতা রহিয়াছে। আর সেই সুযোগটিই গ্রহণ করিয়া থাকেন সরকারি কর্মকর্তা-আমলারা। সুতরাং, যাহারা নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন নাই তাহাদেরও চিহ্নিত করিবার প্রয়োজন আছে। 

অতীতেও আমরা এই ধরনের বিভিন্ন তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতি দেখিয়াছি। সেই তালিকাও একাধিকবার করিতে দেখিয়াছি। ইহাও আরো যাচাই-বাছাই হইবে। রাজাকারের তালিকা চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করিবার কথা রহিয়াছে ২০২০ সালের ২৬ মার্চ। ইহার মধ্যেই তালিকাটি সঠিকভাবে তৈরি করিবার সুযোগ রহিয়াছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী যথার্থই বলিয়াছেন যে অনেক জায়গায় কাগজপত্র সরাইয়া বা উধাও করিয়া ফেলা হইয়াছে। কিন্তু কোনো না কোনো স্তরে ঐ প্রমাণাদি রহিয়া গিয়াছে। সেই প্রমাণাদি বাহির করা হইবে। প্রকৃতপক্ষে তাহাই করণীয়। রাজাকারগণ যুদ্ধকালে অপরাধ করিয়াছে। তাহারা জাতির চোখে দোষী ব্যক্তি। সুতরাং সুনিশ্চিত হইয়াই কাহারো নাম রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। এই ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গফিলতির কোনো সুযোগ নাই।