ড. আর এম দেবনাথ
‘উত্পাদনমুখী খাতে কমছে বিনিয়োগ’। এই খবর নভেম্বর মাসের ২৬ তারিখের। দশ-বারো দিন পর আর একটি খবরের শিরোনাম :‘ভোক্তাদের জিম্মি করে সিন্ডিকেট লুটে নিল কয়েক হাজার কোটি টাকা’। দুটো খবরই দৈনিক ইত্তেফাকের এবং প্রথম পাতার। দৃশ্যত দুটো খবর দুই জগতের। একটি বিনিয়োগ ও শিল্পজগতের, অন্যটি ব্যবসায়-বাণিজ্য জগতের। একটি দেশের অর্থনীতির জন্য অতীব প্রয়োজন, অন্যটি মুনাফাখুরিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আলাদা আলাদা জগতের খবর হলেও অন্তর্নিহিত একটা শিক্ষা আছে। শিক্ষাটি কী? শিক্ষাটি আমার মতে সহজে যদি টাকা কামাই করা যায়, তাহলে টাকাওয়ালারা শিল্পে বিনিয়োগ করবে কেন? শিল্পে যারা বিনিয়োগ করেন তারা বড়ো মাপের ঝুঁকি নেন। শিল্পের জমি পাওয়া যায় না। পেলেও মূল্য খুবই বেশি। গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ সহজে মেলে না। ব্যাংকে ঋণ এখন তপস্যার বিষয়। সুদ মাত্রাতিরিক্ত। সুদের ওপর তস্য সুদ আছে। অবকাঠামোগত অসুবিধা আজও বিদ্যমান। পরিবেশ বিভাগের ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। ঋণপত্র খোলার বুদ্ধি লাগে। শ্রম দিতে হয়, মেধা দিতে হয়। দিনের পর দিন কারখানা করার জন্য লেগে থাকতে হয়। বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়। এসব সমস্যা বিশেষ করে উত্পাদনমুখী শিল্পে। প্রোডাকটিভ সেক্টরে। তারপর সমস্যা ভ্যাটের, উেস কর কর্তনের, আয়করের। শিল্প উদ্যোগে সমস্যার অন্ত নেই। কে যায় এসব করতে যদি বিনা মেধায়, বিনা পরিশ্রমে, বিনা প্রতিযোগিতায় রাতারাতি কোটি কোটি টাকা কামাই করা যায়। করা যায় বিনা বাধায়, বিনা হস্তক্ষেপে, বিনা ট্যাক্সে। অর্থাত্ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। আমরা ছোটো বেলায় দেখেছি অনেক ‘রাখিমালের’ ব্যবসাতে উত্থান-পতন ঘটে। যেমন গুড়ের ব্যবসা। আড়তদার-পাইকাররা গুড় রাখল; কিন্তু গুড়ের দাম পড়ে গেল। তার লোকসান হলো; কিন্তু ব্যবসায়ী হাল ছাড়েননি। গুড়ের ব্যবসাতেই লেগে রইলেন। পরের বছর লাভ হলো, লোকসান পুষিয়েই। পাটের বাজারেও তাই দেখেছি। এক বছর লাভ তো অন্য বছর লোকসান; কিন্তু এখানে কৃত্রিম উপায়ে সংকট সৃষ্টি করে লাভ-লোকসান নয়। স্বাভাবিক চাহিদা-সরবরাহের নিয়মে হচ্ছে বাজার-লেনদেন; কিন্তু এখন দেশে ঘটছে ভিন্ন জিনিস। প্রতিটি পণ্যে ‘সিন্ডিকেট’ তৈরি হয়েছে। চাল, চিনি, সয়াবিন, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, খেজুর, ফল থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্যের জন্য তৈরি হয়েছে খুবই শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এরা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে, বাজার নিয়ন্ত্রণ করে লুটে নেয় হাজার হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি ঘটেছে/ঘটছে পেঁয়াজের ক্ষেত্রে। উত্পাদন ও আমদানির তথ্য মেলালে পেঁয়াজের ঘাটতি নেই। তবু সংকট, কৃত্রিম সংকট। আমদানি যে দামে, বিক্রি চার-পাঁচ গুণে। হঠাত্ একদিনের সংকট হলো লবণে। শত শত কোটি টাকা এক রাতে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর পকেটে। বাজেটের পর, পবিত্র ঈদ উপলক্ষ্যে, অতি বৃষ্টিতে, বন্যায়, খরায়—যখন যেমন পারা যায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে ‘সিন্ডিকেট’। তাদের কথা সবাই জানে। তারা কত টাকা বানাচ্ছে, কর দিচ্ছে কি, দিচ্ছে না—সব খবর সাধারণ মানুষও জানে। তবু দেখা যাচ্ছে সিন্ডিকেট প্রতিবছর পালা করে একেকটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে লুটে নিচ্ছে। মুশকিল হচ্ছে আরেকটি। একটি পণ্যের সংকট হলে এর ধাক্কা অন্য পণ্যেও পড়ে। মানুষ এর থেকেও মুক্তি পায় না। এই যেমন—সবজির দাম। এটা অগ্রহায়ণ-পৌষ মাস। এখন ভরা শীতকাল। এই সময়েই মানুষ খেয়ে-পরে একটু ‘সুখ’ পায়। তাজা মাল, দাম কম। অথচ কী দেখা যাচ্ছে? দেখছি প্রমাণ সাইজের একটি ফুলকপি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ছোটো ছোটো বোয়াল মাছের কেজি ৫০০-৬০০ টাকা। এখন নতুন ধান উঠছে। তবু চালের দাম বাড়ছে। অসম্ভবের দেশ যেন। তা-না হলে এসব হবে কেন? পয়সা বানানোর এমন উগ্র আচরণ কেন? মুশকিল হচ্ছে সহজে পয়সা বানানোর এই ধরনের ব্যবস্থা থাকার ফলে, কোনো শাস্তি না থাকার ফলে, ট্যাক্সের কোনো ঝামেলা না থাকার ফলে সবাই যেতে চায় ঐ পথে। দ্রুত এবং মাত্রাতিরিক্ত টাকা বানাতে পারলে মানুষ শিল্পে যাবে কেন? বলা দরকার—শুধু যে এসব কারণে উদ্যোক্তা/সম্ভাব্য উদ্যোক্তারা উত্পাদনমুখী শিল্পে যাচ্ছে না তা নয়। সমস্যা আরো আছে। খোলাবাজারি নীতির ফরে ব্যবসায়ীদের প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়। দেশে বিরাট একটা বস্ত্রশিল্প আছে যেখানে ৪০-৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োজিত। এটা করা হয়েছিল পোশাক শিল্পের ‘ব্যাক ওয়ার্ড লিঙ্কেজ’ হিসাবে; কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিনা শুল্কের কাপড় আমদানি করে এক শ্রেণির পোশাক রপ্তানিকারক তা ঢাকার ইসলামপুরে বিক্রি করে দিচ্ছে। সহজেই করে নিচ্ছে অতিরিক্ত মুনাফা। এখানেও দেখা যাচ্ছে সহজে টাকা করার প্রবণতা। ফল হচ্ছে এই—এখন আমাদের বস্ত্র শিল্প মার খাচ্ছে। এছাড়া দেখা যাচ্ছে অনেক শিল্পে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটির জন্ম হয়েছে। প্রতিদিন এসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে দৈনিক কাগজগুলোতে। এসব খবর থেকে বোঝা যায় চিনি, ইস্পাত, সিমেন্ট, রড ইত্যাদি শিল্পে ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ তৈরি হয়েছে। এ কারণে ব্যাংকাররা আতঙ্কিত আছেন। এমনকি তৈরি পোশাক খাতেও ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ তৈরি হয়েছে বলে খোদ বিজিএমইএর নেতা রুবানা হক বলছেন। বড়ো বড়ো প্রকল্পের কারণে সিমেন্ট, রড, ইস্পাত শিল্প কিছুটা ব্যবসা করে যাচ্ছে। কোনো কারণে সেখানে চাহিদা কমলে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া বাজারে পরিলক্ষিত হবে। উত্পাদনমুখী শিল্প করতে ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহের কারণ হতে পারে আরেকটি। বড়ো বড়ো হাউজ এখন বিদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। দেশে ব্যবসা করতে তারা উত্সাহী নন। তাদের কথা, সরকার দেড়-দুই বছর যাবত্ চেষ্টা করেও নয়-ছয় সুদ নীতি কার্যকর করতে পারেনি। এই যখন অবস্থা তখন আস্থা তৈরির জায়গা কোথায়? শিল্পে না যাওয়ার আরেকটি কারণ ব্যাংক ঋণের স্বল্পতা। সরকারি ঋণের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের টান পড়েছে। সরকার কী করবে? ট্যাক্স আদায় আশানুরূপ হচ্ছে না। বলা হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়েছে। ইত্তেফাকেরই খবর যন্ত্রপাতি আমদানি এখন কম। গেল অর্থবছরের তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধিও কম। একমাত্র ভালো করছে রেমিট্যান্স। ট্যাক্স আদায় কম হওয়ার কারণে সরকার বাধ্য হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকে। আর যাবে কোথায়? আগে যেত সঞ্চয়পত্রে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সরকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিত। কিন্তু বিরূপ সমালোচনার কারণে সরকার ঐ পথে যাওয়া বাদ দিয়েছে। এখন সমস্যা হয়েছে সরকার বেশি বেশি ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না। এটা একটা বড়ো অভিযোগ। আরো অভিযোগ ব্যাংকাররা ঋণ দিতে আগ্রহী হচ্ছে। আবার ব্যাংকাররা বলছেন তারা পুরোনো ঋণ আদায় করতে পারছেন না বলে লিক্যুইডিটি সংকট তৈরি হয়েছে। মামলা-মোকদ্দমা, শাস্তি ইত্যাদির সম্মুখীন তারা। এছাড়া অনেক ব্যাংক দুই-তিন বছর আগেই ঋণসীমা লঙ্ঘন করেছে। তাদেরকে এখন ঋণসীমায় আসতে হচ্ছে। এসব কারণে ব্যাংকাররা এখন ঋণ দিতে পারছেন না। এছাড়া বাজারে ‘আমানতের’ অভাব। অনেকের ধারণা মানুষের সঞ্চয় কমেছে। বিদেশি অনেক কোম্পানি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে। সেলফোন কোম্পানিগুলো চাকরি ছাঁটাই করছে। নতুন চাকরির অভাব। বাজারে জিনিসপত্রের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। তাই মানুষের সঞ্চয় কম। তাই ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধিও কম। ‘আমানত’ না হলে ‘ঋণ’ হবে কোত্থেকে? এসব কারণে ঝুটঝামেলাহীন মুনাফার দিকে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ছুটছে বলে অনেকের ধারণা। লোভই না কি ব্যবসায়ী/সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের প্রেরণা! কিন্তু অতিলোভ ও কী তাই? মনে হয় না। ব্যবসা নিয়ম-কানুনের মধ্যে করা দরকার। অতিলোভ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। শত হোক ক্রয়ক্ষমতা/চাহিদা ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প কোনোটাই পরিণামে সম্ভব নয়।
n লেখক :অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
