শব্দদূষণ :সচেতনতাই যথেষ্ট

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৪০

বাংলাদেশে অহেতুক হর্ন বাজানোটাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয় বলিয়া মনে করা হয়। শব্দদূষণের ক্ষতি যে কেবল কম শোনা নহে, আরো অধিক কিছু, তাহা নূতন করিয়া উল্লেখ করিবার প্রয়োজন নাই। বরং শব্দদূষণ লইয়া আমরা যে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া উদাসীনতার পরিচয় দিয়া আসিতেছি, তাহা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি রাজধানীর সচিবালয়ের চারপাশ ‘নো হর্ন জোন’ হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। এখন হইতে এলাকাটিতে কোনো গাড়ি হর্ন দিলে আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানার আওতায় আসিবে। অথচ ঐ এলাকায় হর্ন নিষিদ্ধের পরও পূর্বের মতোই উচ্চমাত্রার শব্দ পাওয়া গিয়াছে।

বিশ্বায়নের এই সময়ে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের উন্নত দেশভ্রমণের অভিজ্ঞতা রহিয়াছে। তাহারা সেই সকল উন্নত দেশ হইতে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া দেখিয়াছেন—একটি সভ্য দেশের সাধারণ মানুষ গাড়িতে হর্ন দেওয়াকে কেবল ‘জরুরি’ প্রয়োজন বলিয়া মনে করেন। আর আমরা যেইভাবে হর্নের সুইচের নিকট আঙুলটি চাপ দেওয়ার জন্য সব সময় স্ট্যান্ডবাই রাখি এবং অকারণে হর্ন দিয়া থাকি, সেই হর্নকে যে কোনো ভালো শহরের অধিবাসীরা ‘গালি’ বলিয়া মনে করিবেন। এইদিকে, আইন থাকিলেও প্রয়োগ নাই বিধায় বাংলাদেশে, বিশেষ করিয়া রাজধানী ঢাকায় শব্দদূষণ এক শব্দঘাতকে পরিণত হইয়াছে। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, আগামী পাঁচ বত্সরের মধ্যে ঢাকার মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ কানে কম শুনিবে। ইহাও দুঃখজনক ব্যাপার যে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজধানীর সচিবালয়ের চারপাশ—জিরো পয়েন্ট, পল্টন মোড়, সচিবালয় লিংক রোড হইয়া জিরো পয়েন্ট এলাকাকে নীরব এলাকা ঘোষণার পরও কমিতেছে না শব্দদূষণ। নীরব এলাকায় শব্দের সহনীয় মাত্রা ৫০ ডেসিবেল থাকিবার কথা। কিন্তু গত বুধবার ঐ এলাকায় শব্দের মাত্রা ছিল ৮০ হইতে ১০০ ডেসিবেল পর্যন্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবেল, রাতে ৪৫ ডেসিবেল হওয়া উচিত; বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ডেসিবেল, রাতে ৫৫ ডেসিবেল; আর সাইলেন্স জোনে দিনে ৫০, রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দমাত্রা থাকা উচিত। আমরা হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে সাইনবোর্ডে হর্ন না বাজাইবার নোটিশ দেখিয়া থাকি বটে, কিন্তু আমাদের স্বাভাবিক বোধ যেন অন্ধ থাকে। ঐ সকল সাইনবোর্ড যেন ঝুলাইতে হয় তাই ঝুলানো রহিয়াছে; আর তাহা না মানিবার প্রতিযোগিতাও যেন আমাদের চালকেরা স্বাভাবিক দায়িত্ব বলিয়া মনে করেন। এমনকি অনেক সময় রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনও ১২০ ডেসিবেলের বেশি শব্দ সৃষ্টি করে। কেবল তাহাই নহে, টানা বাজিয়া চলে বিধায় ইহার প্রভাব সাধারণ ১২০ ডেসিবেল শব্দের চাইতেও অধিক হয়।

ইহা এখন সচেতন মানুষমাত্রই জানেন, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হূদেরাগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, আলসার ও বিরক্তি সৃষ্টি হয়। সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু ও বয়স্করা। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর। শব্দদূষণ সেই ‘বোঝার উপর শাকের আঁটি’ হইয়া বসিয়া আছে। অথচ শব্দদূষণের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হ্রাসে আমাদের কেবল সচেতনতাই যথেষ্ট।