‘ঘুষের রেট’ সমাচার

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৪১

বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘুষের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হইয়াছে। তথাপি ঘুষের কারবার হ্রাস পায় নাই। অফিসে অফিসে স্থাপন করা হইয়াছে সিসিটিভি। ই-ফাইলিং ও ই-টেন্ডারিং ইত্যাদির উদ্যোগও গ্রহণ করা হইয়াছে। কিন্তু ঘুষের মচ্ছব কমিয়াছে বলিয়া মনে হয় না। এখন টেবিলের নিচ দিয়া অতি সতর্কতার সঙ্গে ঘুষ দেওয়া-নেওয়া হইতেছে। এমনকি কী পরিমাণ ঘুষ প্রদান করিতে হইবে তাহা বুঝাইয়া দেওয়া হইতেছে আকার-ইঙ্গিতে। নিয়োগ, ভর্তি, বদলি ইত্যাদি বাণিজ্য যথারীতি পূর্বের মতোই রমরমা। কোনো কাজের জন্য ঘুষের রেট কত তাহাও এখন ফিরিতেছে মানুষের মুখে মুখে। ইত্তেফাকে গত বুধবার প্রকাশিত একটি সংবাদে বলা হইয়াছে—কুড়িগ্রামের নাজিম খান কলেজে অধ্যক্ষ নিয়োগে খোদ গভর্নিং বডি প্রকাশ্যে ১১ লক্ষ টাকা দাবি করিয়াছে। এই ক্ষেত্রে কোনো রাখঢাক করা হয় নাই। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই নিয়োগের বিরোধিতা করিতেছে। তাহারা এই গভর্নিং বডি বাতিলের দাবি তুলিয়াছেন। তবে গভর্নিং বডির সভাপতির পালটা বক্তব্য হইল, যাহারা তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করিয়াছেন, তাহারাই অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থীর নিকট হইতে ৪০ লক্ষ টাকা আদায়ের প্রস্তাব করিয়াছেন। অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ বলিয়া কথা! এই পদে এমন দর উঠাটাও অস্বাভাবিক নহে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (পিআইবি) এক প্রতিবেদনে জানাইয়াছে যে, ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা পাইতে ৫০০ হইতে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। একজন সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করিতে ঘুষ দিতে হয় ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। ইহার জন্য আসলে একেক জায়গায় রহিয়াছে একেক রেট। এদিকে পুলিশ বিভাগে ৫৬ খাতে তথা ঘাটে ঘাটে ঘুষ দিতে হয়। মামলার এজাহার বাবদ রেট, চার্জশিট বাবদ রেট, মামলার ফাইনাল বাবদ রেট, চার্জশিট বা এজাহারে নাম জড়াইয়া দেওয়ার রেট, হয়রানি মামলায় জড়াইয়া দেওয়ার রেট, তেল খরচের রেট, মামলা তদন্তের নামে রেট, জিডি বাবদ রেট, ভয়ভীতি হইতে বাঁচার রেট, ক্রসফায়ারের হাত হইতে রক্ষার রেট, সাক্ষীর রেট ইত্যাদি পাতায় পাতায় আরো অজানা রেট রহিয়াছে। আছে বড়ো-ছোটো সাহেবের নামে রেট, অফিস সহকারীদের নামে রেটও। প্রকৌশলী অফিসে ইঞ্জিনিয়ারদের নামে রেট, সিন্ডিকেটের নামে রেট, দুই নম্বর কাজের বিনিময়ে বিল করিয়া দেওয়ার নামে রেট ইত্যাদি রেটের সীমা নাই। শিক্ষা অফিসে শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন প্রাপ্তি, এমপিওভুক্তিকরণ, শিক্ষকের পেনশন তোলা—সব ক্ষেত্রে আছে রেট। স্বাস্থ্য বিভাগের ক্ষেত্রে হাসপাতালে রোগী ভর্তি, অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ, সার্টিফিকেট প্রদান এমনকি লাশের ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষেত্রেও রেট রহিয়াছে। আবার বিদ্যুত্ বিভাগে মিটার রেট, সংযোগ রেট, সংযোগ স্থানান্তর রেট, ট্রান্সফরমার লোড বৃদ্ধির রেট, তদন্ত প্রতিবেদনের নামে রেট, লাইন সংযোগের নামে রেট, অর্থাত্ এখানেও রহিয়াছে রেটের ছড়াছড়ি।

এই রেট বাণিজ্যের ফর্দ বিশাল। সচিবালয় হইতে শুরু করিয়া তৃণমূল পর্যন্ত রহিয়াছে এই রেট বাণিজ্য। প্রবাদে আছে—সর্বাঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা। ঘুষের রেট বাণিজ্যেরও একই অবস্থা। এই রেট বাণিজ্য সহনশীল করিতে হইলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। সরকারি-বেসরকারি অফিসে দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন নীতি গ্রহণ করিতে হইবে।