ইত্তেফাক রিপোর্ট
রাজধানীর মিরপুরের শাহআলীর রাইনখোলা ঈদগাহ মাঠসংলগ্ন এলাকায় বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৪। গ্রেফতারকৃতরা হলেন : মোহাম্মদ আরিফুল করিম চৌধুরী ওরফে আদনান চৌধুরী, মেহেদী হাসান শাকিল ওরফে বাবু, আব্দুল আল মামুন ওরফে আসাদুল্লাহ হিল গালিব এবং নাজমুল হাসান।
বৃহস্পতিবার কাওরান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, গ্রেফতারকৃতদের শরীর ও সঙ্গে থাকা ব্যাগ তল্লাশি করে জঙ্গি সংগঠনের বিভিন্ন ধরনের উগ্রবাদী বই, লিফলেটসহ উগ্রবাদী ডিজিটাল কনটেন্ট, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স সার্কিট, ডিভাইস, ব্যাটারি ও মোবাইল ফোন সেট উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মোবাইল ফোন সেটের ফরেনসিক পরীক্ষা করে কিছু পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বিশেষ করে পুলিশের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিল। কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস নয়, বরং চাপাতি দিয়ে পুলিশ সদস্যদের টার্গেট করে হামলার পরিকল্পনা ছিল তাদের। আর হামলার সময় কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস বা ফোন ব্যবহার না করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। দুই-তিন জন মিলে আলাদা গ্রুপে ভাগ হয়ে পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা করে পালানোর পরিকল্পনা করছিল। গত তিন মাসে এই গ্রুপের ২৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
র্যাবের এ কর্মকর্তা বলেন, তারা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে অবৈধ আখ্যায়িত করে, তথাকথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জঙ্গিবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এই কার্যক্রমকে যারা প্রতিহত করার চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তির ব্যবস্থা করাই তাদের লক্ষ্য। এজন্য তারা নিজেদের মধ্যে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জারসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে আলোচনা করত। এছাড়াও তারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণসহ অস্ত্র ও চাঁদা সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা স্বীকার করেছে।
গ্রেফতারকৃত আরিফুল করিমের বাড়ি চাঁদপুরে। তিনি কম্পিউটার সাইন্সে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা শেষ করে একটি ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি অনলাইনে কম্পিউটারের সামগ্রী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের ব্যবসা করছিলেন। একসময় তিনি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ২০১৫ সালে খিলগাঁও এলাকা থেকে তিনি গ্রেফতার হন। গ্রেফতার হওয়ার পর ব্যাংক তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি আনসার আল ইসলামে যোগ দেন। জোরালো তত্পরতার কারণে সংগঠনের ঢাকা অঞ্চলের একাংশের শীর্ষস্থানীয় আমির পদ পায়। ফেসবুকে সংগঠনের অন্যতম শীর্ষ নেতা বর্তমানে কারান্তরীণ মো. আব্বাসউদ্দিন ওরফে শুকুর আলীর সঙ্গে পরিচিত হয় এবং তার মাধ্যমে জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রমে আরো তত্পর হয়। পরে অনলাইনে বিভিন্ন জঙ্গিবাদী আইডি থেকে জঙ্গি সংক্রান্ত পোস্ট ডাউনলোড করে এবং বিভিন্ন জঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হয়। প্রায় তিন বত্সর ধরে এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে।
গ্রেফতার হওয়া মেহেদী হাসান শাকিলের বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। বর্তমানে প্যারা মেডিক্যালে অধ্যয়নরত। তিনি আব্বাসউদ্দিন ওরফে শুকুর আলীর সঙ্গে অ্যাপের মাধ্যমে আনসার আল ইসলাম সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন। তাদের কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে দলে যোগদান করেন। প্রায় দুই বছর ধরে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। ম্যাসেঞ্জার, ইমো এবং বিভিন্ন ছদ্মনামে আইডি ব্যবহার করে অনলাইনে বিভিন্ন রকম জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন।
গ্রেফতারকৃত আব্দুল আল মামুনের বাড়ি চাঁদপুরে। তিনি আলীম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। জেলে থাকা আব্বাসউদ্দিনের সঙ্গে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে তার প্রথম পরিচয় হয়। এরপর জঙ্গি সংগঠনের বিভিন্ন আইডির সঙ্গে পরিচিত হয় এবং জঙ্গিবাদী বিভিন্ন কার্যকলাপে আগ্রহী হয়। পরে কুমিল্লা অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি আব্বাসউদ্দিনের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে দীক্ষা নেয়। বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ভিডিও, বইপত্র, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সংগ্রহ করত। প্রায় দুই বছর ধরে সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। গ্রেফতারকৃত নাজমুল হাসানের বাড়ি মাগুরায়। একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে চাকরি করছিলেন। অনলাইনে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম চালাতেন। এবিটির শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি গ্রেফতার মো. মেহেদী হাসান শাকিল ওরফে বাবু তাকে দাওয়াত দেয় এবং বিভিন্ন বই, লিফলেট ও ভিডিও সরবরাহ করে। সংগঠনের প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন অনলাইন অ্যাপ হাতে-কলমে শিক্ষা নেয়। প্রায় তিন বছর ধরে এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। শীর্ষ জঙ্গিদের মধ্যে সে একজন। তার কাছ থেকে বিভিন্ন উগ্রবাদী ডিজিটাল কন্টেন্ট পাওয়া গেছে।
