ড. মিল্টন বিশ্বাস
গতকাল থেকে শুরু হয়েছে বহুল প্রত্যাশিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সম্মেলন। দুই দিনব্যাপী ২১তম জাতীয় সম্মেলনে নতুন করে নেতৃত্ব আসছে। রয়েছে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নানাবিধ প্রতিশ্রুতি প্রকাশের প্রত্যাশা। সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশন আজ ২১ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। এ অধিবেশনেই আগামীর জন্য দলের নেতৃত্ব ঘোষণা করা হবে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরোনো ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে আত্মপ্রকাশ ঘটে আওয়ামী লীগের। প্রায় দুই দশক পর এ দলটির নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনৈতিক সংগ্রাম, যুক্তফ্রন্ট গঠন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়সহ বিভিন্ন ঘটনার মধ্যদিয়ে পঞ্চাশের দশকেই আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। এরপর ১৯৬২ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন ও ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,‘বাঙালির যা প্রাপ্তি, তা আওয়ামী লীগের হাত ধরেই এসেছে। যে দলের নেতা (বঙ্গবন্ধু) সংগঠনের জন্য মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন, সে দলের শিকড় কত গভীরে?’ মুসলিম লীগের প্রগতিশীল একটি অংশের উদ্যোগে বাঙালি জাতির মুক্তির লক্ষ্যে গঠিত হয়েছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’।
প্রতিষ্ঠাকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দলটির সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে যাত্রা শুরু করলেও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নাম হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ নাম নেয় দলটি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সময় এ দলটি সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন করে জনগণের মধ্যে আস্থার স্থান তৈরি করে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দেন বঙ্গবন্ধু, যাকে বাঙালির মুক্তির সনদ নামে অভিহিত করা হয়। ছয় দফার ভিত্তিতেই সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।
আওয়ামী লীগ দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছু রেখাচিত্র অঙ্কন করা যেতে পারে। জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। কেবল নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার সময় নয়, শেখ হাসিনা যে কোনো দলীয় অনুষ্ঠানে বলে থাকেন, তরুণদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য তার নেতারা নিজেদের বর্তমানকে উত্সর্গ করছেন। কারণ এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। বিশ্বের অন্যতম উন্নত রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে এটি। বিশ্বের ১১তম সুখী দেশের তালিকায়ও আছে বাংলাদেশ।
বিশ্বের ষষ্ঠতম ভাষা হিসেবে বাংলা অনেক আগে থেকে স্বীকৃত। আসামের শিলচরের ভাষা-সংগ্রামীদের কথা মনে রেখেও বলা যায়, আমরাই একমাত্র ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছি। অন্যদিকে বাংলাদেশ শক্তিশালী ১০টি মুসলিম দেশের একটি। এখানে (কক্সবাজারে) রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো সমুদ্র সৈকত। বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো লোনাপানির ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। নিজস্ব অর্থায়নে বিশ্বের দীর্ঘ সেতু নির্মিত হচ্ছে ‘পদ্মা সেতু’ নামে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সবচেয়ে বেশি সৈন্য পাঠিয়েছে বাংলাদেশ।
এ দেশটি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্বে ২৭তম, গার্মেন্টস শিল্পে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এ দেশটি ২০৫০ সালে বিশ্বের অন্যতম ১০টি ক্ষমতাধর দেশের একটিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। একাত্তরের প্রধান প্রধান যুদ্ধাপরাধীর বিচার শেষ করে এ দেশ পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আসলেই লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা এবং ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়ার ইতিহাসই আমাদের গৌরবান্বিত করেছে। আমরা এ দেশ নিয়ে গর্ব করতেই পারি। আর এ গৌরব অর্জনে যে দলটির সবচেয়ে বেশি অবদান, সেটি হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’। সবাই এক কথায় স্বীকার করবেন যে, আওয়ামী লীগ একটি সংগ্রামী রাজনৈতিক সংগঠন। এ দলের অভ্যুদয়ও সংগ্রামের মধ্যদিয়ে।
আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জন বিপুল। কারণ এ দলটি জনগণের সংগঠন। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগঠনের অন্যতম এ দল। আওয়ামী লীগ দেশপ্রেমিক সংগ্রামী, প্রতিবাদী, নির্ভীক ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবমান। উদার জাতীয়তাবাদের আদর্শের কারণে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রণীত অর্থনীতিতে বিশ্বাসী সংগঠন। রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশ ও জনগণের উন্নয়ন।
আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাপক। জনগণের প্রত্যাশা ও দাবি, আসুন আমরা মানুষ হত্যার রাজনীতি পরিহার করে দেশ ও জনগণের উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠনমূলক রাজনীতি শুরু করি; রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে সরকার পরিচালনায় সহায়তা করি। কারণ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আওয়ামী লীগ এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশকে বিশ্বসভার মধ্যমণিতে আসীন করার জন্য। সফল বাংলাদেশ দেখতে হলে শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কোনো বিকল্প নেই।
n লেখক :অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
