নজরুলের বাংলাদেশ

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১১

ড. গুলশান আরা

 

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত প্রায় সব অনুষ্ঠানই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিল, তবে দেশাত্মবোধক গান এবং ‘চরমপত্র’ ছিল তুলনারহিত। দেশের গানের মধ্যে ‘বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ/ জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের যে তার নেইকো শেষ’ শুনে মোহিত হতাম।

দেশ স্বাধীন হলো—দুঃস্বপ্ন থেকে স্বপ্নে ফিরে এলাম। বিশ্বকবির সোনার বাংলা, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা হিসাবে নয়—স্বাধীন হলো বাংলাদেশ হিসেবে নজরুলের বাংলাদেশ!

পরবর্তীকালে নজরুলকে নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখলাম বাংলাদেশ নিয়ে নজরুলের চিন্তাচেতনা কত গভীর সেইসঙ্গে কত আন্তরিক ছিল। কবিতায়, গানে, গল্পে, প্রবন্ধে তাঁর সৃষ্টিকর্ম জুড়ে বাংলাদেশ। গানে যখন তিনি গেয়ে ওঠেন ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লি-জননী’, তখন ষড়ঋতুর বাংলাদেশ এসে দাঁড়ায় আমাদের সামনে। কিশোর বয়সে এসেছিলেন  বাংলাদেশে—সেই সোনালি স্মৃতি মায়াবী জোসনার মতো তাঁর সত্তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল; তার প্রমাণ ‘অগ্নিগিরি’, ‘আল্লা রাখা’, ‘পদ্মগোখরা’, ‘পুতুলের বিয়ে’ প্রভৃতি গল্প-নাটিকায়। এদেশের আঞ্চলিক ভাষায় কতটা পারঙ্গম ছিলেন সেটিও জানা যায়।

আর প্রবন্ধে যা তিনি জানালেন, বাংলাদেশ এবং বাঙালি সম্বন্ধে তা চির সত্য হয়ে রইল আমাদের জন্য। ‘বাঙালির বাঙলা’য় নজরুল লিখলেন, ‘বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে—‘বাঙালির বাংলা’ সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে।’ ১৯৭১-এ আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম এবং অসাধ্য সাধন করে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ করেছি। এই প্রবন্ধেই নজরুল প্রশ্ন করেছেন, ‘বাংলার অভাব কোথায়?’ বাংলার তো সবই আছে ‘বাংলার শিয়রে প্রহরীর মতো জেগে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম গিরি হিমালয়।...এই হিমালয়ের গভীর হূদ-গুহার অনন্ত স্নেহধারা বাংলার শত শত নদ-নদী রূপে আমাদের মাঠে-ঘাটে ঝরে পড়ছে।...বাংলার মাটি নিত্য উর্বর। এই মাটিতে নিত্য সোনা ফলে। এত ধান আর কোনো দেশে ফলে না। পাট শুধু একা বাংলার।...এত ফুল এত পাখি, এত গান, এত সুর, এত কুঞ্জ, এত ছায়া, এত মায়া আর কোথাও নেই। এত আনন্দ, এত হুল্লোড়, আত্মীয়তাবোধ পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এত ধর্মবোধ—আল্লাহ, ভগবানের উপাসনা, উপবাস-উত্সব পৃথিবীর আর কোথাও নেই।...আমাদের অভাব কোথায়? অতি প্রাচুর্য আমাদের বিলাসী, ভোগী করে শেষে অলস, কর্মবিমুখ জাতিতে পরিণত করেছে।...’

কবির পরামর্শ—‘বাঙালিকে, বাঙালির ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও:

এই পবিত্র বাংলাদেশ

বাঙালির—আমাদের।

দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’

তাড়াব আমরা, করি না ভয়

যত পরদেশি দুস্য ডাকাত

‘রামা’দের ‘গামা’দের।

বাঙলা-বাঙালির হোক। বাঙলার জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।’

‘জয় বাংলা’ যেটিকে আজ শুধু স্লোগান নয়—চেতনাও বলা হচ্ছে আর এটিকে জাতীয় স্লোগান হিসেবে বাধ্যতামূলক করার নির্দেশনা আসছে। ভাবতে অবাক লাগলেও সত্য যে এই কথাটি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ গানে প্রথম ব্যবহার করেছেন—

‘জয় বাঙলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি অন্তরীণ,

জয় যুগে যুগে আসা সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি অন্তহীন!’

ঢাকা