মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশের ২ কোটি শিশু

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১৭

সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে দেশের প্রায় ২ কোটি শিশু। সাধারণত স্কুলে শিশুরা সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে একেবারেই থাকে উদাসীন। তবে কেবল শিশুদের উদাসীনতাকেই দায়ী করলে চলবে না। কারণ স্কুলের টয়লেটগুলোতে হাত ধোয়ার জন্য থাকে না পর্যাপ্ত সাবানের ব্যবস্থা। এছাড়া পরিবারেও বাবা-মায়েদের অসচেতনতার কারণে শিশুরা সঠিকভাবে হাত ধোয় না। ফলে স্কুলে যাওয়া প্রামাঞ্চলের শিশুরা স্বাস্থ্যকর টয়লেটের অভাবে জীবাণুর সংক্রমণে ভোগে।

তাছাড়া প্রতি বছর শিশুরা ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডের মতো মারাত্মক জীবাণুবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়। শুধু পরিষ্কার টয়লেট ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এবং যথাযথভাবে হাত ধোয়ার ফলে এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সমপ্রতি ইউনিসেফ পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ৫৬ মিলিয়ন (৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষ অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন রোগে ভোগে। এর মধ্যে দরিদ্র ২১ মিলিয়ন (২ কোটি ১০ লাখ) মানুষ এখনও স্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার করেন না। আর প্রায় ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) শিশু তাদের স্কুলে স্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার করতে পারে না। তাছাড়া সারা দেশে শুধু এ কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে প্রায় ২ কোটি শিশু।

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এক গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন অংশে সরবরাহ করা জারের পানির ৯৭ শতাংশ পানিতে মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু (কলিফর্ম) পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পানিতে এক ধরনের শৈবাল থাকে- যা কলেরা সৃষ্টির জন্য মোক্ষম উপাদান। আবার গরমে রান্না করা খাবারগুলো বেশিক্ষণ ভালো থাকে না। এগুলো না বুঝে খেয়েও ফুড পয়জনিং হয়ে থাকে। এই দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর টয়লেট সব মিলিয়েই ব্যাপক ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। কেন না, তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কোনোভাবেই এ ধরনের জীবাণুর আক্রমণকে প্রতিহত করতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন ২০ শতাংশ লোক। তারা সাধারণত শহরের বস্তিতে কিংবা গ্রামের অস্বাস্থ্যকর স্থানে বাস করে। তাদের টয়লেট সব সময় পরিচ্ছন্ন থাকে না এবং সেই টয়লেট অনেকে ব্যবহার করে। শহরে যেমন একটা বাসায় বা একটা রুমের জন্য একটি টয়লেট থাকে। গ্রামে বা স্কুলে সেটা থাকে না। ফলে গ্রামে এবং বস্তিতে সেই টয়লেট থেকেই জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে। আমাদের শরীরে অনেক রোগ ও সংক্রমণ হাতের মাধ্যমে ছড়ায়। সারা দিনে বিভিন্নভাবে হাত নোংরা হয়, হাতের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ জন্মাতে সাহায্য করে। টয়লেট ব্যবহারের পর হাত না ধোয়াই পরিচিত অনেক রোগের কারণ।

এছাড়া হাতের মাধ্যমে ছড়ানো ভাইরাসগুলোই শ্বাসনালির সংক্রমণের মতো মারাত্মক রোগের কারণ। অপরিষ্কার ও দূষিত হাত নিজের শরীরে জীবাণু ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সংস্পর্শে আসা অন্য সবার মাঝেও জীবাণু ছড়িয়ে দেয়। এজন্য শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্ত বয়স্কদেরও হাত ধোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে জানাতে হবে ও হাত ধোয়ার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে।

পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূলত হাত ধোয়া নিয়ে। শিশুরা টয়লেট থেকে এসে হাত সাবান দিয়ে কিংবা মাটি বা ছাই দিয়ে ধুলেও তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকত না। আমরা বাচ্চাদের হাত ধোয়া শেখাই না। গ্রামের বা বস্তির বাচ্চাদের হাত ধোয়া শেখানো উচিত। কিন্তু আমরা হাত ধোয়া শেখাই শহরের স্কুলগুলোর বাচ্চাদের। নোংরা পরিবেশে যারা থাকে তাদের আমরা হাত ধোয়া শেখাই না। ফলে ডায়রিয়া, কলেরা থেকে শুরু করে, শ্বাসতন্ত্রের যত রকম রোগ আছে, বিশেষ করে আপার রেস্প্রেটরি, আমাশয়, কৃমি এ ধরনের রোগে শিশুরা বেশি ভোগেন। ওইসব শিশু আবার পুষ্টিহীনতায়ও ভোগে। পুষ্টিহীনতার কারণে তারা রোগাক্রান্ত হয় বেশি, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।

অধ্যাপক ডা. মুজাহেরুল হক বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে উত্তরণের উপায় হসেবে  শিশুদের টয়লেট থেকে এসে হাত সাবান দিয়ে ধোয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। গ্রামাঞ্চলের শিশুদের এই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে শিশুরা ১০টা রোগ থেকে রেহাই পাবে। এছাড়া পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর রাখতে হবে। মলমূত্র ত্যাগের স্থান পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, যাতে জীবাণু না ছড়ায়। পরিচ্ছন্নতার দিকে জোর দিতে হবে।