নগরে ‘কৃষকের বাজার’ মিলছে বিষমুক্ত সবজি

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:২৭

তখনো পুরোপুরি ভোর হয়নি। একে তো বেশ ঠান্ডা, সঙ্গে কুয়াশা। জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের রাস্তায় অল্প কিছু যানবাহন আসা-যাওয়া করছে। এরমধ্যেই ছোটো পিকআপ ভ্যানে করে কৃষক সবজি নিয়ে ঢুকছেন রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর সেচ ভবন প্রাঙ্গণে ‘কৃষকের বাজারে’। কৃষক সরাসরি তাদের উত্পাদিত সবজি ভোক্তার কাছে বিক্রি করছেন এখানে। ভোক্তাদের বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি পাওয়ার যে আকুতি, তা মিটছে এই বাজার থেকে। কারণ কৃষকের এই বাজারে সবজি বিক্রির একটাই শর্ত, সবজি চাষে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা যাবে না। কেবল জৈব সার ব্যবহার করে সবজি চাষ করতে হবে। তাই এই বাজার ঘিরে রাজধানীর ক্রেতাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।  

সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, কৃষি বিপণন অধিদফতর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উদ্যোগে রাজধানীর সেচ ভবন প্রাঙ্গণে কৃষকের বাজারের উদ্বোধন করা হয়। সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার দুই দিন এই বাজার বসে। সকাল ৭টায় শুরু হয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজারের কার্যক্রম চলে। রাজধানীর আশপাশের জেলা-উপজেলার নির্বাচিত কৃষকরা এই বাজারে তাদের উত্পাদিত সবজি বিক্রি করেন। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ‘কৃষকের বাজার’ বসানো হবে বলে জানা গেছে।

গতকাল শুক্রবার সকালে সরেজমিনে বাজারে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা তাদের উত্পাদিত সবজি দোকানে থরে থরে সাজাচ্ছেন। অনেক ক্রেতা সবজি দেখছেন, দরদাম করছেন।              অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আনোয়ারুল ইকবাল সবজি কিনতে এই বাজারে এসেছেন। তিনি জানান, প্রতিদিন সকালে তিনি জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে প্রাতঃভ্রমণ করেন। সেচ ভবনে কৃষকের বাজার বসায় সপ্তাহের সবজি তিনি এখান থেকেই কিনছেন। তবে এখানে সবজির দাম কিছুটা বেশি বলে তিনি মনে করেন। আনোয়ারুল ইকবাল বলেন, যেহেতু কৃষক সরাসরি এখানে ভোক্তাদের কাছে তার সবজি বিক্রি করছেন। এখানে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নেই। তাছাড়া বাজার বসাতে কোনো ভাড়াও লাগে না। তাই দাম কিছুটা কম রাখা যেতে পারে। তবে বিষমুক্ত সবজি পাচ্ছি এটাই বড়ো বিষয়।

কোন সবজির কত দাম:কৃষকের এই বাজারে আলু, বেগুন, শিম, লাউ, পটল, মিষ্টি কুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রুকলি, রেড ক্যাবেজ, কলা, পেঁপে, টমেটো, লেটুস, বিট, স্কোয়াস, ক্যাপসিকাম, লাউশাক, পালংশাক, লালশাক, বরবটিসহ প্রায় সব ধরনের সবজি পাওয়া যায়। গতকাল প্রতি কেজি আলু ৪০ টাকা, বেগুন ৫০ টাকা, শিম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, একেকটি লাউ ও মিষ্টি কুমড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকা,  ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, ব্রুকলি ৪০ টাকা, রেড ক্যাবেজ ৭০ টাকা, কলা ৩০ টাকা হালি, পেঁপে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, পাকা টমেটো ৮০ টাকা, স্কোয়াস ৮০ টাকা, সবুজ ক্যাপসিকাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা কেজি, লাউ, পালং ও লালশাক ১০ থেকে ২০ টাকা আঁটি ও বরবটি ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

সবজি পরীক্ষা করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ: সংশ্লিষ্টরা জানান, ভোক্তাদের বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি দেওয়ার পাশাপাশি কৃষকের তার উত্পাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য দিতেই সরকার এ বাজারের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ৮০ হাজার কন্ট্রাক্ট ফার্মারের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উত্পাদনের এই উদ্যোগ নিয়েছে। গত এক বছর ধরে প্রশিক্ষণ ও তদারকির মাধ্যমে এই কৃষকদের প্রস্তুত করা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকার আশপাশের মোট আটটি উপজেলা থেকে এই বাজারে বিক্রির জন্য সবজি নিয়ে আসছেন কৃষকরা। সামনে বাজার ও কৃষকের সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে। বাজারে আসা সবজি সত্যিকার অর্থেই কীটনাশকমুক্ত কি না তা পরীক্ষা করে দেখে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)।

কৃষকের বাজার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই কৃষক যেন তার উত্পাদিত ফসল সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করতে পারেন, সে জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকরা কীটনাশকমুক্ত সবজি উত্পাদন করে এই বাজারে নিয়ে আসবেন। এতে ভোক্তারা যেমন কীটনাশকমুক্ত সবজি পাবেন, তেমনি কৃষকরাও পাবেন ন্যায্যমূল্য। ভবিষ্যতে এটি বৃহত্ পরিসরে করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

কৃষকেরা যা বললেন:এই বাজারে বিক্রির জন্য সাভার থেকে সবজি নিয়ে এসেছেন শ্রেষ্ঠ চাষি হিসেবে সরকারি পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক মো. রফিজউদ্দিন। সত্তরোর্ধ্ব এই কৃষক বলেন, সরাসরি ভোক্তাদের কাছে সবজি বিক্রি করতে পেরে ভালো লাগছে। সবজির ভালো-মন্দ সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে জানতে পারছি। তিনি বলেন, আমাদের দেশের সবজির মান অনেক ভালো।

আমাদের একটা ফুলকপির ওজন এক-দেড় কেজি পর্যন্ত হয়। অথচ থাইল্যান্ডে দেখেছি ৭০০ গ্রামের ওপরে সেখানে ফুলকপি হয় না বললেই চলে। তিনি আরো বলেন, আমাদের মাটি উর্বর। এই মাটিতে যা লাগানো যায় তা-ই হয়, শুধু একটু পরিচর্যা দরকার।

সাভারের জামসিং গ্রাম থেকে এসেছেন মাহফুজা আক্তার মুন্নি। তিনি তার চাষ করা মাশরুম নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে ৯ কেজি মাশরুম নিয়ে এসেছিলাম। সব বিক্রি হয়ে গেছে। এবার ১২ কেজি নিয়ে এসেছি। বেশ ঠান্ডা পড়ায় আজ বাজারে ক্রেতা একটু কম। তার পরও সব বিক্রি হয়ে যাবে বলে আশা করছি। প্রতি কেজি মাশরুম ৩০০ টাকা করে বিক্রি করছেন বলে তিনি জানান।

মুন্সীগঞ্জের বজ্রযোগিনী ইউনিয়নের পুকুরপাড়া গ্রামের কৃষক সিরাজ খান এসেছেন তার উত্পাদিত সবজি নিয়ে। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে আগের চেয়ে সচেতনতা বেড়েছে। তারা এখন কীটনাশকমুক্ত সবজি খোঁজে। তিনি বলেন, বাজার আস্তে আস্তে জমতে শুরু করেছে। এটা ধরে রাখতে হবে।

নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন থেকে সবজি নিয়ে এসেছেন মোবারক হোসেন, হজরত আলী ও হাসান আলী। তাদের ১৫০ জন কৃষকের একটি গ্রুপ আছে। তারা ১১০ বিঘা জমিতে সবজি চাষ করেন। তাদের উত্পাদিত সবজি ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, কাতার, দুবাই পাঠানো হয় বলে জানালেন। মোবারক হোসেন বলেন, তাদের নারায়ণপুর ইউনিয়নকে সবজি চাষে মডেল ঘোষণা করেছে সরকার। তাদের উত্পাদিত সবজি জৈব সার দিয়ে চাষ করা হয়। এই জৈব সার তারা নিজেরাই তৈরি করেন।

বাজারে আসা মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি অফিসার এম মাসুজ্জামান বলেন, কীটনাশক দিয়ে সবজি চাষ করা হলে তা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। এটা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, জৈব সার দিয়ে আবাদ করলে ফলন ভালো হয়, কিন্তু ধীরে হয়। তার এলাকা থেকে যেসব কৃষক এই বাজারে তাদের সবজি নিয়ে এসেছেন, তাদের উত্পাদিত সবজি চাষ তিনি তদারকি করেন বলে জানান।