দেশের জ্বালানি তেল, এলপি গ্যাস, লুবঅয়েল শিল্পের বিশ্লেষণ

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১১

মো. আহসান হাবিব হিরক

আমাদের জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রণ কিন্তু BPC ও তার অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের ওপর। পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠান পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল আমদানি এবং প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে BPC ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের মোট বিক্রয়ের পরিমাণ ৬৯ লাখ ৪৮, হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন। এই পুরো কর্মকাণ্ডে BPC ও তার অঙ্গপ্রতিষ্ঠান যে খুব ভালো কাজ করেছে তা কিন্তু আমরা কেউই বলব না। তারা কিন্তু দেশের অন্যান্য আর্থিক ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে শত শত কোটি টাকা ঋণী। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এই অবস্থা? তাহলে সরকার কেন বেসরকারি খাতকে যথাযথভাবে ব্যবহার করছে না? বেসরকারি খাতকে রিফাইনারি স্থাপনে দেশের জ্বালানি তেলজাত পণ্যের অবাধ বিপণনের অপরিশোধিত তেলের সহজ অনুমোদন প্রদান করে প্রাকৃতিক গ্যাস ফিল্ডের Condensate ব্যবহার করে তেল উত্পাদন করে যদি আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সেভেন সিস্টার, মানে  উত্তর-পূর্ব দিকের সাতটি প্রদেশে তেল-গ্যাস রপ্তানি করা হয়, তাহলে দেশের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতে রিফাইনারি বিনিয়োগ লাভজনক এবং তেল উত্পাদনে যথেষ্ট পরিপূর্ণতা পাবে। সোজা কথা হলো, তেলের সঙ্গে জড়িত রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের যদি দুর্নীতি বন্ধ করা যায়, তাহলে জ্বালানি তেলের যথাযথ ব্যবহারে রাতারাতি পরিবর্তন আসবে বলে আমি মনে করি। এবার আসি এলপি গ্যাসের ব্যবসা, প্রসার, বিনিয়োগ, পরিবেশ ইত্যাদি সম্পর্কে। এলপি গ্যাসের বিনিয়োগ সোজা কথায় একেবারেই ভয়াবহ। পুরোনো কোম্পানিগুলো অনেকটাই ভালো অবস্থানে আছে, পক্ষান্তরে নতুন এলপিজি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ পুরোপুরি হুমকির মধ্যে আছে। কারণ বিশ্লেষণ করলে খুব সহজেই  বোঝা যাবে, নতুন একটি এলপিজি কোম্পানি মাদার টার্মিনাল কি স্টোরেজ টার্মিনাল বা ম্পেরিকাল ট্যাংক, মূল ফ্যাক্টরি স্থাপন, স্যাটেলাইট প্লান্ট স্থাপন, রোড ট্যাংকার , ববটেল ক্রয় ও অনান্য ফ্যাক্টরি স্থাপনাসহ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়ে থাকে। ভালো কথা, এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক আছে, কিন্তু এলপি গ্যাস কোম্পানির আয় আসে মূলত রিফিল গ্যাস বিক্রয় থেকে। সোজা কথা, মার্কেটে যার যত সিলিন্ডার আছে, তার তত আয় বা মুনাফা আছে। পুরোনো কোম্পানির প্রচুর পরিমাণ সিলিন্ডার দেশ জুড়ে মার্কেটে বিস্তার করে আছে। পক্ষান্তরে নতুন এলপিজি কোম্পানির নতুন প্যাকেজ (সিলিন্ডার ও গ্যাসসহ) বিক্রয়ে আয় তো দূরের কথা, ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। তার মানে দাঁড়ায়, যদি কোনো নতুন এলপিজি কোম্পানি শুরুর অবস্থায় ১০ লাখ সিলিন্ডারের মার্কেট করার চেষ্টা করে, তাহলে ঐ প্রতিষ্ঠানের ১৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হবে। কিন্তু আবার প্রচুর ঝুঁকিও আছে। যেমন ইদানীং রিং রোলিং রড কোম্পানিগুলো সিলিন্ডারকে স্ক্র্যাপে পরিণত করার কারণে এলপিজি শিল্পের যথেষ্ট ক্ষতি সাধন করছে। এর সঙ্গে আছে ছোটো কিছু নামসর্বস্ব স্যাটেলাইট কোম্পানির অবৈধ ক্রস ফিলিংয়ের  অত্যাচার। এ থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে এলপিজি কোম্পানিগুলো অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে সরে এসে LPG Operators Association of Bangladesh (LOAB) ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরক পরিদপ্তর এবং BERC-এর সঠিক ও কঠিন নীতিমালা করে সিলিন্ডারের বাজারমূল্য বৃদ্ধি করা।

বিনিয়োগ বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, দেশের জনগণ উপকৃত হবে। আমি স্পষ্ট বলতে চাই, সবার প্রচেষ্টায় এই অচল অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো বা উত্তরণ সম্ভব। BPC-এর যমুনা পেট্রোলিয়াম ছাড়া আরো বেশ কিছু লুবঅয়েল ব্লেন্ডি কোম্পানি বাংলাদেশে আছে। ভালো লুববেজ অয়েল এবং এডিটিভস আমদানি করে আরো নতুন নতুন ব্লেন্ডিং ফ্যাক্টরি স্থাপন করে কোয়ালিটি পণ্য উত্পাদন করা খুবই জরুরি। কারণ ভেজাল লুবঅয়েলে সয়লাব বাংলাদেশ। এতে পরিবহন ও শিল্প খাতে অনেক লোকসান গুনতে হয়। ভালো লুব্রিকেন্টস ব্যবহার না করার কারণে যন্ত্রাংশের আয়ুষ্কাল কম হয়। এতে দেশের রাজস্বের ক্ষতি হয়।

n লেখক :জ্বালানি তেল,গ্যাস বিশেষজ্ঞ