চার দিন ধরে টানা কনকনে শীতের দাপট চলছে রাজধানী ও উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। ঘন কুয়াশা আর উত্তুরে হিমেল হাওয়া এ শীতের তীব্রতা আরো বাড়িয়েছে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় গত দুই দিনে মৌলভীবাজারের শমসেরনগর, কানিহাটি ও ডবলছড়া চা-বাগানে নারীসহ চার জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যানবাহন, ফেরি, নৌ ও বিমান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। হাসপাতালে বেড়েছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা।
রাজধানীতে বুধবার থেকে জেঁকে বসা পৌষের শীতের তাপমাত্রার পারদ কমছে প্রতিদিনই। গতকাল শনিবার সৃকালে তা নেমে আসে ১২.২ ডিগ্রি সেলিসিয়াসে; যা চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন। আবহাওয়া দপ্তর বলছে, উত্তর-পশ্চিম শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ (জেড বায়ু) বেশি সক্রিয় থাকায় এবং কুয়াশা ও জলীয় বাষ্পে আর্দ্রতা বেশি হওয়ায় তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। দিনে তাপমাত্রা না বাড়ায় ঠাণ্ডা জেঁকে রয়েছে। এসময় কুয়াশা স্তর নিচে নেমে আসায় মেঘলা আবহাওয়া বিরাজ করছে।
আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বলেন, এটা পৌষ মাস। এ মাসে এ রকম আবহাওয়া স্বাভাবিক। তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও শীতের তীব্রতা আরো দুই-তিন দিন থাকবে। তবে গত কয়েক দিন ধরে চলা শৈত্য প্রবাহ এখন কেটে গেছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা বাড়ছে। আগামীকাল সোমবার থেকে শীতের কামড় কমতে শুরু করবে। গতকাল সকাল ৯টায় দেশের সর্বনিম্ন ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে। আগের দিন দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা কম থাকলে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে বলে ধরা হয়। তবে দেশের কোথাও তা ছিল না। আবহাওয়া অফিস বলছে, আজ সারাদেশের দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকবে; তবে বাড়তে পারে সামান্য।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দীন আহমেদ বলেন, শীতের মাত্রা ঢাকা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের দিকে বেশি। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলে বাতাস বইছে। সূর্যের জন্য আরো কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে। ২৬ বা ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আবহাওয়া এমনই থাকতে পারে। এ সময়ের মধ্যে হয়তো স্থান ভেদে কোথাও কোথাও সূর্য কিছুক্ষণের জন্য দেখা দেবে। কিন্তু সূর্যের তীব্রতা থাকবে না।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, যশোর ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
আমাদের সংবাদদাতারা জানান, দেশের কোনো কোনো জেলায় সরকারের পক্ষ থেকে শীতের কম্বল বিতরণ করা হলেও তা যত্সামান্য। কম্বল বিতরণ নিয়েও অনিয়মের খবর মিলছে কোনো কোনো স্থান থেকে। দিনাজপুর, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, শেরপুর, পাবনা, রাজশাহী, কিশোরগঞ্জ ও নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় অসহায় লোকজন খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।
শীতের কবল থেকে বাঁচতে খড়-কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে গিয়ে রংপুর অঞ্চলে অন্তঃসত্ত্বাসহ আট নারী দগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিন জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদিকে ঘন কুয়াশায় যানবাহন, ফেরি, নৌ ও বিমান চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। গতকাল সকালে ঢাকার শাহজালাল ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত, যশোর, কক্সবাজার, সৈয়দপুরসহ সবগুলো বিমানবন্দরে কুয়াশার কারণে চার ঘণ্টা বিমান ওঠানামা বন্ধ রাখতে হয়। পদ্মার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ৫ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ থাকার পর আবার চালু হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ, নভোএয়ার ও ইউএসবাংলার সাতটি ফ্লাইট ঢাকা ছেড়ে যেতে পারেনি।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, শৈত্য প্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের জনজীবন। প্রচণ্ড ঠান্ডায় দুই দিনে শমসেরনগর কানিহাটি ও ডবলছড়া চা-বাগানের নারীসহ বয়োবৃদ্ধ চার জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলে—শমসেরনগরের ডবলছড়া চা-বাগানের সুবল চাষার ছেলে রাখাল চাষা (৪৬), আপ্পালু কুর্মীর স্ত্রী দাঙ্গামা কুর্মী (৬০), ডবলছড়া বাগানের রাজেন্দ্র তুলিয়ার স্ত্রী বুলেশ্বরী তুলিয়া (৬০) এবং কানিহাটি চা-বাগানের মিরা বীনের ছেলে হরিয়া বীন (৬০)।
