১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর। দেশের দু-একটা অঞ্চল হানাদারমুক্ত ও স্বাধীন হচ্ছে। কোথাও কোথাও উড়ছে লাল সবুজের পতাকা। তখনো চলছে বৃহত্তর কুমিল্লার হোমনার বড়ো ঘাগুটিয়ার যুদ্ধ। ঐ দিন ভোরে বাঞ্ছারামপুর থেকে চার-পাঁচ শ পাকহানাদার বাহিনী লঞ্চযোগে এসে তিতাস নদীর কোল ঘেঁষেই হোমনা থানার বড়ো ঘাগুটিয়া গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন বড়ো মসজিদ প্রাঙ্গণে শক্ত অবস্থান নেয়। এ খবর পেয়ে ঘাগুটিয়া ও ভবানীপুর গ্রামবাসী বাড়িঘর ফেলে পার্শ্ববর্তী মাধবপুর, রামপুর ও নালাদক্ষিণ গ্রামে আশ্রয় নেন। হোমনা থানার বিভিন্ন গ্রামের দুই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা দুলালপুর চন্দ্রমনি উচ্চ বিদ্যালয়ে একত্রিত হয়ে হানাদারবাহিনীর ওপর আক্রমণ করলে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পাথালিয়াকান্দির অলেক মিয়া শহিদ হন এবং আহত হন ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। পাকিস্তানি অনেক সৈন্যও হতাহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। রামপুর, নুরালাপুর, শেখ আলমের বাগ ও ছোটো ঘাগুটিয়া গ্রামে বাংকার বসিয়ে হানাদারবাহিনীকে অবরুদ্ধ করে রাখে। হানাদারবাহিনী সময় সময় গুলি চালালে মুক্তিযোদ্ধারাও গুলি চালিয়ে তার পালটা জবাব দিতে থাকেন। ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর পাকবাহিনী ঘাগুটিয়া গ্রামের ১৩১টি ঘরে আগুন দেয়। এ সময় ঘাগুটিয়া গ্রামসহ পাশের গ্রামের ১৮ জন নিরস্ত্র নারী পুরুষ শহিদ হন।
ভারতীয় মিত্রবাহিনী ঘাগুটিয়ার যুদ্ধ সম্পর্কে অবগত হলে ১৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর তিনজন সৈন্য ঘাগুটিয়া এসে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ওয়ারলেসের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য আহ্বান জানান। কিন্তু তারা যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ১৮ থেকে ২১ ডিসেম্বর পাকবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সময় সময় যুদ্ধ চলে। ২২ ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্র বাহিনী কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনটি ট্যাঙ্ক নিয়ে এসে পুনরায় ওয়ারলেসের মাধ্যমে তাদের আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানান। কিন্তু এতেও হানাদারবাহিনী আত্মসমর্পণ না করায়, মিত্রবাহিনী ট্যাঙ্ক থেকে সরাসরি তীব্র গোলা বর্ষণ করতে থাকে। মিত্রবাহিনীর এমন তীব্র আক্রমণের ফলে হানাদারবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও অনেক সৈন্য মারা যায়। ২২ ডিসেম্বর বিকেলে ১৮১ জন জীবিত ও আরো বেশ কিছু আহত পাকবাহিনীর সৈন্য মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে ঘাগুটিয়া গ্রাম থেকে বেরিয়ে আসে। ২৩ ডিসেম্বর হোমনা শত্রু ও হানাদার মুক্ত হয় এবং তারপর থেকে ২৩ ডিসেম্বর হোমনা হানাদারমুক্ত দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়ে থাকে।
১৯৭১-এ এই ঘাগুটিয়ার যুদ্ধ বাংলাদেশের সর্বশেষ যুদ্ধ। এই যুদ্ধে শহিদদের স্মরণে তিতাস নদীর পাড়ে নির্মিত হয়েছে ‘বড়ো ঘাগুটিয়া মক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ’।
