‘বাংলাদেশের এক ব্যতিক্রমী বাতিঘর’

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:২৬

তার চলে যাওয়ায় সবাই শোকে মূহ্যমান। স্যার ফজলে হাসান আবেদ এদেশের প্রান্তিক পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানুষের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নয়নে নীরবে ভূমিকা রেখে গেছেন। শুধু ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাই নয়, আরো অনেক সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। তার সেই নিভৃতচারী, অনন্য রূপটিই ফুটে উঠল বিশিষ্টজনদের স্মৃতিচারণায়।

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে ফজলে হাসান আবেদের স্পর্শ পেয়েছে। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় কিংবা যেকোনো উপায়ে প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু না কিছু কাজে এসেছে। এই বিষয়টি পৃথিবীর ইতিহাসেও এক অনন্য নজির। তিনি কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন না, অথচ তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সুশৃঙ্খল। মানুষের জীবন পরিবর্তনে তা ভূমিকা রেখে চলেছে। এটাও অসাধারণ একটা দৃষ্টান্ত। একজন ব্যক্তি এত ভিন্ন মাত্রায় মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে বিশাল ভূমিকা রেখে চলেছেন, যা বাংলাদেশ ও পৃথিবীর মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দিচ্ছে—এটাও এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্যার ফজলে হাসান আবেদ একজন মহান ব্যক্তি। বিশ্বেও সমধিক খ্যাতিমান। তিনি হূদয়বান ও বিনয়ী ছিলেন। দরিদ্র মানুষের ভাগ্য ফেরাতে অবদান রেখেছেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করে দারিদ্র্য বিমোচনে তার যে অবদান, তা অনন্য দৃষ্টান্ত। জাতি তার মৃত্যুতে শোকাহত। আওয়ামী লীগের              সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘স্যার ফজলে হাসান আবেদ একজন জনদরদি অসাধারণ মানুষ ছিলেন। তার শূন্যতা কোনো দিন পূরণ হবে না। তার তুলনা তিনি নিজে। এদেশে অনেক এনজিও কার্যক্রম আছে। ফজলে হাসান আবেদ ছিলেন একেবারে প্রচারবিমুখ। নীরবে, নিঃশর্তভাবে তিনি বাংলার তৃণমূল পর্যন্ত তার কার্যক্রম ছড়িয়ে দিয়েছেন। দেশব্যাপী ব্র্যাকের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয়েছে। শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও ব্র্যাকের কার্যক্রম বিস্তৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের তৃণমূলের মানুষের জন্য তার অসামান্য অবদান রয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে অবদান আছে তার। তিনি চলে গেলেও তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, স্যার ফজলে হাসান আবেদ একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ, যারা পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশের নারীদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে, তাদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে তার অবদান অপরিসীম। তিনি বিশ্বে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তার কথা বাংলাদেশসহ বিশ্বের মানুষ চিরকাল মনে রাখবে। তার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘৩০ বছর তার সঙ্গে কাজ করেছি। গণসাক্ষরতা অভিযানের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তাকে দেখেছি মানুষের জন্য কী অসাধারণভাবে কাজ করেছেন। তার মতো নিঃস্বার্থ মানবদরদি মানুষ খুব কম দেখেছি জীবনে। আমরা মনে করি, তিনি হয়তো খুব আরামপ্রিয়। তা নন, সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে তিনি গ্রামে গিয়ে কাজ শুরু করেছেন। সেখান থেকে তিলে তিলে ব্র্যাক গড়ে তুলেছেন। তার মতো বিনয়ী, প্রচারবিমুখ মানুষ খুব কম দেখেছি। কথা কম বলে মানুষের জন্য নীরবে কাজ করে যাওয়া তিনি জাতির এক ব্যতিক্রমী বাতিঘর।’

ব্র্যাকের কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য স্থপতি লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘তিনি ছোটো করে ভাবতেন না। তার সব ভাবনাই ছিল মানুষকে কেন্দ্র করে। সেই মানষ শুধু বাংলাদেশের মানুষ নয়, বিশ্বের মানুষের কথাও ভাবতেন। মানুষকে ভালোবাসাই ছিল তার সব কাজের অনুপ্রেরণা। তার সঙ্গে কাজ নিয়ে এটাই আমার প্রথম উপলব্ধি। বড়ো পরিসরে ভাবা, যে কোনো কিছুকে ক্ষুদ্র গণ্ডিতে না রেখে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভাবতে শিখিয়েছেন তিনি। তার সেই শিক্ষা নিয়েই আমাদের সামনে চলতে হবে। আমরা যদি তা পারি, সেখানেই স্যার ফজলে হাসান আবেদ বেঁচে থাকবেন।’

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক এবং ফজলে হাসান আবেদের জামাতা আসিফ সালেহ বলেন, ‘পরিবারের প্রত্যেকের সঙ্গে ফজলে হাসান আবেদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। কারো জীবন পরিবর্তনের জন্য তিনি কাউকে নীতিবাক্য দিতেন না, বাস্তববাদী পরামর্শ দিতেন। তার স্ত্রী মারা গেছেন ১৯৮১ সালে। এত বড়ো একটি প্রতিষ্ঠান চালানোর পাশাপাশি তিনি পরিবারকেও সময় দিতেন। তার কাজের কথা সারা বাংলাদেশের মানুষ জানত। মানুষ হিসেবে তিনি অনন্য ছিলেন। শুধু ব্র্যাক নয়, বাংলাদেশের বেশির ভাগ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এটা অনেকেই জানেন না। তিনি এসব প্রতিষ্ঠানেরও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন।’