স্যার ফজলে হাসান আবেদের কফিনে ফুল দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন একজন ভক্ত। ছুটে বেরিয়ে গেলেন চত্বর থেকে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন তিনি। কান্নাজড়ানো গলায় বললেন, ‘আবেদ ভাই আপনি দেখতে পাচ্ছেন, দেশের মানুষ আপনাকে ভালোবাসা জানাতে এসেছে।’ শোকার্ত জনতার জোয়ার যেন আছড়ে পড়েছিল বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে। দরিদ্র মানুষের ভাগ্য বদলে দেওয়া জাদুকরের মৃত্যুতে শোকে আকুল বাংলাদেশের মানুষ। সারাদেশের মানুষের কাছে তিনি আত্মার আত্মীয়। সেই ভালোবাসাই তারা জানাতে এসেছিলেন ফুল হাতে নিয়ে। মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল বাংলার আকাশ। হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তার কফিনে রেখে গেছেন ফুলের তোড়া। বলেছেন, ‘তোমাকে আমরা ভুলব না।’
গতকাল রবিবার ফুলেল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন শেষে হাজার হাজার জনতার অংশগ্রহণে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় আর্মি স্টেডিয়ামে। সেখান থেকে পরে বনানী কবরস্থানে স্ত্রীর কবরে দাফন করা হয় স্যার ফজলে হাসান আবেদকে। আর্মি স্টেডিয়ামে আনার আগে কিছু সময়ের জন্য তার মরদেহ নেওয়া হয় মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে।
প্রিয় ‘আবেদ ভাই’কে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে সকাল থেকেই আর্মি স্টেডিয়াম এলাকায় মানুষের পদচারণা জনস্রোতে রূপ নেয়। হাতে হাতে ফুল। সবাই ফুলে ফুলে ছেয়ে দিতে চান প্রিয় মানুষটির কফিন। বলতে চান ‘ভালোবাসি’। ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ এসেছিলেন এই ক্ষণজন্মা মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে।
সারা জীবন ধরে মানুষের জন্যই ছিল তার সব কাজ। বিরামহীনভাবে যে মানুষটি অকাতরে বিলিয়েছেন ভালোবাসা, আজ তিনি নীরব। তার নিথর দেহ শোকে কাতর করে তুলেছে পুরো দেশকে। গতকাল শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে, জানাজায় এবং বনানী কবরস্থানে দাফনে—সর্বত্র সর্বস্তরের জনতার ঢল নেমেছিল প্রিয় মানুষটিকে একবার দেখার জন্য।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। শ্রদ্ধা জানিয়েছেন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস যেমন শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, তেমনি যশোরে ব্র্যাকের গাড়িচালক মো. রেজাউল ইসলাম ছোট্ট ব্যাগ হাতে চলে এসেছেন প্রিয় আবেদ ভাইকে শ্রদ্ধা জানাতে। আবেগে কথা বলতেই পারলেন না তিনি। ব্র্যাকে ৩০ বছর কাজ করেছেন। কখনোই প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কথা হয়নি তার। তারপরও ভালোবাসার টান সুদূর যশোর থেকে ঢাকায় টেনে এনেছে মানুষটিকে। এই ভালোবাসা কোনো কিছু দিয়েই মাপা যায় না।
বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। দারিদ্র্য দূর করা, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, নারী নেতৃত্ব সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্রঋণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার অবদান বাংলাদেশের মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক ও উন্নয়ন ধারণা বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। মানুষের জীবনে উন্নয়নের ছোঁয়া দিয়েছেন, দিয়েছেন শিক্ষার আলো। তিনি নেই, কিন্তু তার সব কাজের মাঝে বেঁচে থাকবেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ।
জানাজা :স্যার ফজলে হাসান আবেদের জানাজা পড়ান গুলশান কেন্দ্রীয় আজাদ মসজিদের ইমাম মাওলানা আহসান উল্লাহ। এ সময় মানুষের ঢল নামে। জানাজা শুরু হওয়ার আগে ফজলে হাসান আবেদের ছেলে সামেরান আবেদ বলেন, ‘সবাই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিয়ে আমাদের ব্র্যাক পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কষ্ট করে যারা এসেছেন, পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমার বাবা সারাটি জীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তিনি কাউকে দুঃখ দিয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন।’
শেষ শ্রদ্ধা :বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের মরদেহে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে স্যার আবেদের কফিনের পাশে ছিলেন মেয়ে তামারা আবেদ, ছেলে সামেরান আবেদ, জামাতা আসিফ সালেহ্সহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মেজর আশিকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তার উপসামরিক সচিব কর্নেল মো সাইফুল্লাহ। এরপর শ্রদ্ধা জানান জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, বাহাউদ্দিন নাছিম প্রমুখ।
এছাড়া ফজলে হাসান আবেদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলী খান, রাশেদা কে চৌধূরী, মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট আর্ল মিলার, ড. কামাল হোসেন, জাতীয় পার্টির (এ) আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. ম তামিম, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ইমান আলী, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষে সারা যাকের, জিয়াউদ্দিন তারিক আলী প্রমুখ।
আরো শ্রদ্ধা জানায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, জাতিসংঘ ঢাকা কার্যালয়, এফবিসিসিআই, এমসিসিআই, প্রশিকা, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, নিজেরা করি, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নারী প্রগতি সংঘ, মেট্রোপলিটন চেম্বার, বাংলা একাডেমি, ব্র্যাক ব্যাংক, গুলশান সোসাইটি, ব্যুরো বাংলাদেশ, বেঙ্গল ইনস্টিটিউট, গ্রামীণফোন, প্রিপ বাংলাদেশ, গণসাক্ষরতা অভিযান, নারীপক্ষ, বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ভাসানী প্রজন্ম পরিষদ, জনস্বাস্থ্য আন্দোলন, নাগরিক উদ্যোগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি, দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট, সিআরপি, মায়া, কনসার্ন, আশা, দৈনিক সংবাদ, আড়ং, আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন, সিসিডিবি, এইড কুমিল্লা, টিএমএসএস, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি প্রভৃতি সংগঠন।
